• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ফ্রিজ খুলে খাবার তছনছ

পুলিশের টের পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালালো ভালুক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০৪ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তর জাপানের একটি পরিবারের জন্য রাতের খাবারের প্রস্তুতি মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্কে। রান্নাঘরে ঢুকে তারা দেখতে পান, একটি বুনো ভালুক তাদের ফ্রিজ খুলে খাবারদাবার তছনছ করছে। ভয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে ভালুকটি বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জাপানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোকালয়ে ভালুকের অনুপ্রবেশ এবং মানুষের ওপর প্রাণঘাতী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত পরিবর্তন, গ্রামীণ এলাকায় জনসংখ্যা হ্রাস এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট—সব মিলিয়ে মানুষ ও ভালুকের সংঘাত এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় উত্তরাঞ্চলের তোহোকু অঞ্চলের ইওয়াতে প্রিফেকচার থেকে একটি জরুরি ফোনকল আসে। ফোনে একটি পরিবার জানায়, তাদের বাড়ির রান্নাঘরে একটি ভালুক ঢুকে পড়েছে।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে এবং পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, ভালুকটি রান্নাঘরে ঢুকে সরাসরি ফ্রিজ খুলে ভেতরের খাবার বের করে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। খাবারের সন্ধানে প্রাণীটি বেশ কিছু সময় রান্নাঘরে অবস্থান করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থলে পাওয়া পায়ের ছাপ থেকে বোঝা যায়, ভালুকটি পরে রান্নাঘরের পাশের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। বের হওয়ার আগে বাড়ির আবর্জনার পাত্রও তল্লাশি করে সেখানে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট খোঁজার চেষ্টা করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনায় পরিবারের কেউ আহত হননি। তবে হঠাৎ বাড়ির ভেতরে বুনো ভালুক দেখতে পাওয়ায় তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন।

ঘটনাটি ঘটেছে ইওয়াতে প্রিফেকচারের শিজুকুইশি শহরে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ৫ জুলাইয়ের পর থেকে এই শহরের অন্তত আরও চারটি পরিবার তাদের বাড়িতে ভালুক ঢোকার অভিযোগ করেছে।

এ কারণে এলাকাবাসীকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের রাতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, বাড়ির বাইরে খাবার বা আবর্জনা না ফেলা এবং ভালুক দেখলে নিজেরা ধরার চেষ্টা না করে দ্রুত পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মনে করছে, খাবারের সন্ধানেই ভালুকগুলো জনবসতিতে ঢুকে পড়ছে।

জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ভালুকের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই উত্তরাঞ্চলের তোহোকু অঞ্চলের বাসিন্দা।

এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে ভালুকের হামলায় রেকর্ড ১৩ জনের মৃত্যু হয়, যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বেশি প্রাণহানির ঘটনা জাপানে আগে খুব কমই দেখা গেছে। ফলে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন ভালুক নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

প্রতি বছর শীতকালে ভালুক দীর্ঘ সময় শীতনিদ্রায় থাকে। বসন্ত ও গ্রীষ্মের শুরুতে তারা খাদ্যের সন্ধানে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এ বছর শীতনিদ্রা শেষে বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ভালুক দেখা যাওয়ার ঘটনা দ্রুত বেড়ে গেছে। শুধু পাহাড়ি অঞ্চল নয়, ছোট শহর, আবাসিক এলাকা এবং শিল্পাঞ্চলেও ভালুকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ভালুক এখন দিনের বেলাতেও লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা অতীতে তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল।

গত জুনে টোকিওর উত্তরের উৎসুনোমিয়া শহরে একটি ভালুক কয়েক দিন ধরে অবাধে ঘোরাফেরা করায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

প্রাণীটিকে ধরতে পুলিশ, পেশাদার শিকারি এবং সিটি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যৌথভাবে চার দিন অভিযান চালাতে হয়।

নিরাপত্তার স্বার্থে ওই সময় শহরের বহু স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং শিক্ষার্থীদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অবশেষে দীর্ঘ অভিযানের পর ভালুকটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

এরও আগে ফুকুশিমা প্রিফেকচারে আরেকটি ভালুকের আচরণ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রাণীটিকে "অত্যন্ত বুদ্ধিমান" বলে বর্ণনা করেন। কারণ, এটি একটি ভবনের জানালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে এবং পানির কলও চালু করতে সক্ষম হয়েছিল।

পরে একই ভালুক দুটি কারখানায় চারজনের ওপর হামলা চালায়।

হামলার পর সেটি কয়েক দিন ধরে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল। এ সময় এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কেন বাড়ছে মানুষ-ভালুক সংঘাত?

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে ভালুকের সঙ্গে মানুষের সংঘাত বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালুকের সংখ্যা বেড়েছে। সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল হওয়ায় অনেক এলাকায় তাদের প্রজননও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অঞ্চলে জনসংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ায় বহু কৃষিজমি ও বসতি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব এলাকা এখন বনাঞ্চলের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় ভালুক সহজেই মানুষের বসতিতে প্রবেশ করতে পারছে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে অনেক সময় বনাঞ্চলে ভালুকের স্বাভাবিক খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যায়। তখন তারা খাবারের খোঁজে আবাসিক এলাকায় চলে আসে।

বিশেষ করে বাড়ির বাইরে রাখা আবর্জনা, ফলের গাছ, পশুখাদ্য কিংবা সহজে পাওয়া খাদ্যের গন্ধ ভালুককে আকৃষ্ট করে।

সতর্কতার আহ্বান

ক্রমবর্ধমান ঘটনার পর জাপানের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়ির বাইরে খাবারের উচ্ছিষ্ট বা আবর্জনা খোলা অবস্থায় রাখা উচিত নয়। পাহাড়ি বা বনসংলগ্ন এলাকায় একা চলাচল এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভালুক দেখা গেলে ছবি তোলার বা কাছে যাওয়ার চেষ্টা না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বনাঞ্চলের সীমানা এবং জনবসতির মধ্যকার ব্যবধান কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

ভিওডি বাংলা/আরআর/আ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
সম্প্রতি ভারতে ৮ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। । ছবি: সংগৃহীত
ভারতে ফের করোনা শনাক্ত
ছবি:সংগৃহীত
ইরানকে নেতানিয়াহু 'হামলা হলে পাল্টা আঘাত অনিবার্য'
ছবি: সংগৃহীত
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে যে বার্তা দিলো ভারত