অপরিকল্পিত নগরায়ণে ভুগছে ঢাকা: ডিএসসিসি প্রশাসক

আগের প্রশাসনের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা, উধাও ঠিকাদার, আদালতের স্থগিতাদেশ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে রাজধানীর উন্নয়নকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
একই সঙ্গে জলজট নিরসনে পলিথিন নিষিদ্ধ, খাল খনন এবং নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর নগর ভবনে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুস সালাম বলেন, রাজনীতি বা সমাজ সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব জনগণের সমস্যা সমাধানে কাজ করা। বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যরা নিয়মিত নাগরিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সিটি করপোরেশনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে এমন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, যাদের এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার কিছু উন্নয়নকাজ বাতিল করতে গেলেও সংশ্লিষ্টরা আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কের কাজ আটকে রয়েছে এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বিশেষ করে নতুন ওয়ার্ডগুলোতে এখনো রাস্তা, ড্রেন ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এসব এলাকায় উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। শুধু সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ে এ ধরনের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতেই ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়।
তিনি জানান, ৫০ ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুটি কমিউনিটি সেন্টার অল্প ব্যয়ে চালু করা সম্ভব হলে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে সেগুলো চালুর ব্যবস্থা করা হবে।
খেলার মাঠের বিষয়ে আবদুস সালাম বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ গড়ে তুলতে চান, যাতে ছেলেমেয়েরা মাদক থেকে দূরে থেকে খেলাধুলায় যুক্ত হতে পারে।
মাদককে সামাজিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু পুলিশ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ এবং অতীতের বিভিন্ন নীতিগত কারণেও এ সমস্যা বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে পারলে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি জামায়াতে ইসলামীর দুই সংসদ সদস্যকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁরা সব সময় সমন্বিতভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, শুধু খাল পরিষ্কার করলেই হবে না, খননও করতে হবে। রাজধানীর অধিকাংশ খাল অবৈধ দখলে চলে গেছে। আবার অনেক খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী পথ না থাকায় জলজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিডিআর ট্র্যাজেডির পর পানি নিষ্কাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ারও প্রভাব রয়েছে।
প্রশাসক বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত জলাবদ্ধতা নিরসন-সংক্রান্ত বৈঠক করছেন। ইতোমধ্যে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে চলতি বর্ষায় এর সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। আগামী বর্ষার আগে মানুষ এর সুফল পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নতুন এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রশস্ত সড়কের অভাব এবং রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জলজটের অন্যতম কারণ হিসেবে পলিথিনকে দায়ী করে আবদুস সালাম বলেন, পলিথিন অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে হবে। নিউমার্কেট এলাকায় ড্রেন থেকে কয়েক বস্তা পলিথিন অপসারণ করতে হয়েছে। এসব পলিথিন ড্রেনের মুখ বন্ধ করে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে আগে যেখানে দুই-তিন দিন পানি জমে থাকত, এখন পাম্পের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কামাল সাহেবের এলাকার বড় অংশ আগে জলাভূমি ছিল। সেখানে পানি ভরাট করে বসতি গড়ে ওঠায় কিছু সমস্যা থাকবেই। তবে এখন যেহেতু এটি নগর এলাকা, তাই পানি যাতে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করাই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। ওই এলাকায় একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরেকটির কাজ চলমান রয়েছে।
নতুন ওয়ার্ডগুলোতে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা, ড্রেন ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর আদায়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না জানিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মের বাইরে ট্যাক্স আদায় করলে সরাসরি তাঁকে জানাতে হবে। নতুন বা পুরোনো—কোথাও নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কর আদায় করা হবে না। একই সঙ্গে জনগণের সুবিধার্থে কিছু ক্ষেত্রে কর-ছাড়ও দেওয়া হয়েছে।
আবদুস সালাম বলেন, নাগরিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ‘গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি’ গড়তে হলে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ঢাকা শহরকে পলিথিনমুক্ত করতে পারলেই জলজটসহ অনেক নগর সমস্যার স্থায়ী সমাধান সহজ হবে।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলে ঢাকা ৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা ৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দরা।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু








মন্তব্য