সেকেণ্ডেই সর্বস্বান্ত, তদন্তে যায় বছর

কয়েক মিনিটেই হারিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ফোন কল, এসএমএস, ক্লোন ওয়েবসাইট, ডিপফেক কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে অনলাইন প্রতারক চক্র। প্রতারণার কৌশল যত আধুনিক হচ্ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে তদন্ত ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া। কেন প্রতারকদের শনাক্ত করতে এবং অর্থ উদ্ধার করতে এত সময় লাগে, আর কীভাবেই বদলে যাচ্ছে সাইবার প্রতারণার কৌশল? সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন প্রতারণার তদন্ত এখন শুধু একজন প্রতারককে শনাক্ত করার বিষয় নয়। অর্থের গতিপথ অনুসরণ, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ এবং ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ও টেলিযোগাযোগ সংস্থার সমন্বয় মিলিয়ে এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া।
এই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ আহমেদ আবিদুর রাজ্জাকের ঘটনা। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল পেয়ে তিনি প্রতারকদের নির্দেশনা অনুসরণ করেন। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে তিনি রাজধানীর কলাবাগান থানায় মামলা করেন এবং ওই ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রতারণা
প্রতারণার কৌশল কতটা বদলে গেছে, তার সাম্প্রতিক একটি প্রমাণ মিলেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর এক অভিযানে।
গত ১৬ জুন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), সিআইডি জানায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটের আদলে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে 'এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য' সংক্রান্ত মামলার জরিমানা আদায়ের নামে প্রতারণা চালাচ্ছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
সিআইডির তথ্যমতে, প্রতারকরা সাধারণ মানুষের মোবাইলে ট্রাফিক জরিমানা ও মামলার ভয় দেখিয়ে এসএমএস পাঠাত। সেই এসএমএসে থাকা লিংকে প্রবেশ করলে ভুক্তভোগীরা বিআরটিএর আসল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি ভুয়া সাইটে পৌঁছাতেন। জরিমানা পরিশোধের উদ্দেশ্যে সেখানে ব্যাংক কার্ডের তথ্য দিলে প্রতারকরা বিভিন্ন কৌশলে ওটিপি সংগ্রহ করে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করত।
প্রযুক্তিগত তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, একই কৌশলে একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতারকরা এখন শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়, সরকারি সংস্থার নাম, এআই প্রযুক্তির ধারণা এবং সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থাকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন নোটিশ পেলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে তথ্য যাচাই করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
প্রতারণার ধরন ও কৌশলও বদলায়
একসময় অনলাইন প্রতারণা মূলত ওটিপি বা ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকদের কৌশলও পাল্টেছে। এখন তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেক, ক্লোন ওয়েবসাইট, ভুয়া অ্যাপ, কিউআর কোড, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতারণা করছে।
সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশলের মধ্যে রয়েছে ফিশিং ও স্মিশিং। ফিশিংয়ে ব্যাংক, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট বা ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। আর স্মিশিংয়ে একই কৌশল ব্যবহার করা হয় এসএমএসের মাধ্যমে, যেখানে জরুরি বার্তা বা লোভনীয় অফার দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে একটি লিংকে প্রবেশ করানো হয়।
ফিশিং ও স্মিশিংয়ের বাইরে অনলাইন প্রতারণা এখন আরও বহুমাত্রিক। ডিপফেক ব্যবহার করে রোমান্স স্ক্যাম, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে বিনিয়োগ ও ক্রিপ্টো প্রতারণা, নকল ই-কমার্স সাইটে কেনাকাটার ফাঁদ, কিউআর কোড ও রিফান্ড স্ক্যাম সবই এখন প্রতারকদের পরিচিত কৌশল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সেজে টেক সাপোর্ট স্ক্যাম, লটারি ও পুরস্কারের প্রলোভন, চ্যারিটির নামে অর্থ সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নকল বা হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার, এমনকি র্যানসমওয়্যার ও ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, কৌশল ভিন্ন হলেও প্রায় সব প্রতারণার লক্ষ্য মানুষকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, লোভ বা তাড়াহুড়োর মধ্যে ফেলে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং তথ্য, ওটিপি কিংবা অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। তাই অপরিচিত কোনো ফোনকল, এসএমএস, ই-মেইল বা লিংকে সাড়া দেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করাই প্রতারণা এড়ানোর প্রথম শর্ত।
কেন তদন্তে এত সময় লাগে?
অনলাইন প্রতারণার শিকার হওয়ার পর ভুক্তভোগীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রতারককে শনাক্ত করতে বা অর্থ উদ্ধার করতে এত সময় লাগে কেন? তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাইবার প্রতারণার তদন্তে সময়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের ভাষ্য, প্রতারণার অর্থ কয়েক মিনিটের মধ্যেই একাধিক ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর, ডিভাইস, আইপি ঠিকানা ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও টেলিযোগাযোগ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। ফলে তদন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা ভিপিএন, অস্থায়ী নম্বর, ক্লোন ওয়েবসাইট, ভুয়া পরিচয় এবং বিদেশভিত্তিক সার্ভার ব্যবহার করে। আবার অভিযোগ করতে দেরি হলে অর্থের গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হয়, ফলে তা শনাক্ত ও উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রতারণার শিকার হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোই অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ায়।
স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সংকট
অনলাইন প্রতারণা এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাইবারভিত্তিক প্রতারণা এখন কেবল আর্থিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, অর্থপাচার এবং সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্রের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
সংস্থাটির মতে, শুধু জাতীয় পর্যায়ের অভিযান যথেষ্ট নয়; সাইবার প্রতারণা কার্যকরভাবে দমনে মানবপাচার, অর্থপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই অপরাধ মোকাবিলায় শুধু প্রতারকদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। দ্রুত তদন্ত, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা এই চারটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব না দিলে অনলাইন প্রতারণার বিস্তার ঠেকানো ক্রমান্বয়ে জটিল হয়ে পড়বে।
ভিওডি বাংলা/এমএস/এফএ








মন্তব্য