পাগলির মেলা—শত বছরের ঐতিহ্যের গল্প

আশুরার পরদিন পঞ্চগড় সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ী ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামে যেন ভিন্ন এক আবহের সৃষ্টি হয়। বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকেন হাজারো মানুষ। কারণ, এই দিনেই বসে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী 'পাগলির মেলা'।
এটি শুধু একটি গ্রামীণ মেলা নয়, এটি ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলা।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে আমিরন নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী এই গ্রামে বসবাস করতেন। সবাই তাঁকে চিনতেন 'পাগলি' নামে। গ্রামের নির্জন পরিবেশে থাকলেও আশুরার সময় তিনি মানুষের মাঝে এসে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ এবং শোকের ইতিহাস নিয়ে রচিত মার্সিয়া গীত পরিবেশন করতেন। তাঁর কণ্ঠের আবেগ মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। অনেকে চোখের জল ধরে রাখতে পারতেন না।
আমিরনের মৃত্যুর পর তাঁকে শেখপাড়া গ্রামের সড়কের পাশেই সমাহিত করা হয়। এরপর প্রতিবছর মহররম মাসের ১১ তারিখে মানুষ তাঁর কবর জিয়ারত, দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করতে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই সমাগমই রূপ নেয় একটি ঐতিহ্যবাহী মেলায়। আর সেই থেকেই এর নাম হয়ে যায় 'পাগলির মেলা'।
আজও বহু মানুষ বিশ্বাস নিয়ে এখানে আসেন। কেউ মানত করেন, কেউ দোয়া করেন, আবার কেউ শুধু শত বছরের ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন শেখপাড়ায়।
বিকেল গড়াতেই গ্রামের কাঁচা সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান বসে। বাতাসে ভেসে আসে গরম গরম জিলাপি ভাজার সুগন্ধ। মুড়ি-মুড়কি, মিষ্টি, খেলনা, বাঁশি, বেলুন, প্রসাধনী, মাটির তৈরি তৈজসপত্র এবং স্থানীয় হস্ত ও কুটির শিল্পীদের তৈরি নানা পণ্যে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা।
শিশুদের হাসি, খেলনা কেনার আনন্দ আর মানুষের পদচারণায় জমে ওঠে পুরো এলাকা। প্রবীণরা খুঁজে পান শৈশবের স্মৃতি, আর নতুন প্রজন্ম পরিচিত হয় বাংলার হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্যের সঙ্গে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁদের বাবা-দাদা-প্রপিতামহের সময় থেকেও এই মেলা বসছে। যদিও আমিরন ঠিক কোথা থেকে এসেছিলেন বা কবে মারা গেছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি আজও বেঁচে আছে মানুষের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়।
করোনা মহামারির সময় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও এখন আবার আগের মতোই প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে প্রতিবছর মেলার আয়োজন করা হয়।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এই ঐতিহ্যবাহী মেলার পরিধি আরও বাড়ানো হোক। স্থানীয় কুটির শিল্পী ও মৃৎশিল্পীদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা হোক, যাতে এই মেলা শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ না থেকে পঞ্চগড়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, বদলেছে গ্রামের চিত্র। কিন্তু বদলায়নি শেখপাড়ার পাগলির মেলা। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি বয়ে চলেছে ইতিহাস, বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার হিসেবে।
ভিওডি বাংলা/স্নিগ্ধা খন্দকার/আ








মন্তব্য