তামাক করে শুভঙ্করের ফাঁকি, বড় অংকের রাজস্ব হারানোর শঙ্কা

বাজার বাস্তবতার সাথে সংগতি না রেখে এবং মাঠ পর্যায়ের চিত্র বিবেচনা না করে কাগুজে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেট ও তামাকের নিম্ন এবং মধ্যম স্তরে দাম নির্ধারণের মারপ্যাঁচ এবং দুর্বল করনীতির কারণে সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। ‘তামাক খাতের কর ও নীতি সংস্কার’ বিষয়ক এ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিপিআরসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইহতিসাম হাসান।
এছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণে বাজেট প্রস্তাবনা ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস (আইএইচই)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন এন শিমুল।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করে শুধুমাত্র কাগুজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। দামের পার্থক্যের এই শুভঙ্করের ফাঁকি ও চক্র থেকে যে বিশাল রাজস্ব লোকসান হচ্ছে, তা এখনই ঠেকানো দরকার।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ই-সিগারেটের বিষয়ে সরকারের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি ভুল এবং এর সংজ্ঞায়ন অত্যন্ত দুর্বল করা হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, বর্তমান বাজেটে এটির ওপর ট্যাক্স বা কর আরোপ করে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
এমনকি পাউচকে (তামাকজাতীয় এক ধরনের পণ্য) বৈধতা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। এর ফলে দেশের তরুণ সমাজ এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, দেশে কার্যকর করনীতির মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে স্বাস্থ্য খাতে বছরে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। তিনি আসন্ন বাজেটে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর কাঠামো ঢেলে সাজানোর তাগিদ দেন।
মূল প্রবন্ধে গবেষক ইহতিসাম হাসান বলেন, সরকার বাজেটে নিম্ন স্তরে ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের দাম ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু খুচরা বাজারে মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ক্রেতাই খুচরা পর্যায়ে ৬ টাকা ২০ পয়সায় সিগারেট পাচ্ছেন না, এটি বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৭ টাকায়। একইভাবে মধ্যম স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি শলাকায় ক্রেতাদের প্রায় ৮০ পয়সা বেশি দিতে হচ্ছে। খুচরা বাজারের এই বাড়তি টাকা সরাসরি কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যাচ্ছে, যা থেকে সরকার কোনো কর পাচ্ছে না। শুধুমাত্র এই দুই স্তরের দামের মারপ্যাঁচে সরকার প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব হারাতে চলেছে।
এই বিশাল রাজস্ব ক্ষতি রোধ করতে পিপিআরসির পক্ষ থেকে নিম্ন দুই স্তরের সিগারেটের প্যাকেটের দাম ৬২ টাকার পরিবর্তে ৭০ টাকা এবং মধ্যম স্তরের দাম ৯২ টাকার বদলে ১০০ টাকা নির্ধারণ করার জোর দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাফিউন এন শিমুল বলেন, তামাকের কর ও মূল্যবৃদ্ধি কেবল সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর উপায় নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। তামাক পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে পারলে লাখ লাখ তরুণকে ধূমপানে অকালমৃত্যু ও ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সরকারকে রাজস্বের আড়ালে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে না ফেলার আহ্বান জানান তিনি।
ভিওডি বাংলা/খতিব/এফএ







