সরকারের ১০০ দিন
৬০ সিদ্ধান্তের ৩৭টি বাস্তবায়ন, ভুগিয়েছে জ্বালানি আর হাম

বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বাড়তি চাপে থাকা তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার ১০০ দিন পার করেছে। যেখানে নতুন করে চেপে বসা জ্বালানি সঙ্কট এবং হাম পরিস্থিতিও সরকারকে বেশ ভুগিয়েছে। আর মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দিন পার করছে সরকার।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই ছিল আলোচনায়। বাড়তি চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট।
সব মিলিয়ে সরকারের এই সময়কালকে মূলত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সঙ্কট ব্যবস্থাপনার সময় হিসেবেই বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ৩৭টি বা ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দিয়েছে সরকার।
যদিও ৫ বছর মেয়াদি সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়নে ১০০ দিন যথেষ্ট নয়। তবে শুরুটা কেমন হলো, এটাও গুরুত্বপূর্ণ, এ কথাই বলছেন বিশ্লেষকেরা।
শুরু থেকেই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেয়া কিছু পদক্ষেপ যেমন প্রশংসিত হয়েছে। তেমনি কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমালোচনার মুখেও ফেলেছে সরকারকে। নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য খাতভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার প্রক্রিয়া শুরুর যে কথা সরকার বলছে তা দ্রুত দৃশ্যমান হতে হবে ইতিবাচক ফলাফলের মধ্য দিয়ে। এমন প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
যদিও ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতিকে সামাল দেয়ার যে চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে রয়েছে, সেখানে কতটা সফল হবে, সেটা বুঝতে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আসন্ন বাজেটেই বোঝা যাবে যে সরকার আসলে অর্থনীতি নিয়ে কী ভাবছে। তাদের প্রায়োরিটি বুঝতে বাজেটটা আমাদের দেখতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তারা ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে কাজ করছে এবং বেশিভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেয়া কিছু পদক্ষেপে সরকার যেমন ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগসহ বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহার ও ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেশ কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনো তেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পাশাপাশি অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে উদ্বেগ এখনও কাটেনি।
অবশ্য সরকারের এই সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা এবং খেলাপি ঋণের হার এখনো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভর্তুকি দেয়ার সক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি এবং আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া সরকারের জন্য বড়ো পরীক্ষা।
অর্থনীতিবিদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার (যেমন: কর ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার) ছাড়া কেবল মাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগে এই চ্যালেঞ্জগুলো স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
এছাড়া র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক, সেখান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করা হচ্ছে।
র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি এক সময় বিএনপির এজেন্ডায় থাকলেও, সরকার একটি আইনি কাঠামোয় এনে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও কাঠামোগত স্বচ্ছতা জরুরি।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারকে শুরু থেকেই নানামুখী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, এমন বার্তা আগেই পাওয়া গিয়েছিল।
এছাড়া জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সামাল দেওয়াও বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড়ো পরীক্ষা হবে বলেই আভাস দিয়েছিলেন বিশ্লেষকরা। যার নজির সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদসহ নানা ইস্যুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকার বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান।
তিনি বলছেন, সরকার একদিকে সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
তবে জুলাই সনদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে শপথ গ্রহণের দিন থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিরুদ্ধ অবস্থান নেওয়ায় সংসদে বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়েছে বিএনপি। তারা সংসদের বাইরেও আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সরকার শুরু থেকেই নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে বলে মনে করেন সিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলছেন, ‘সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তার পদক্ষেপগুলো আগে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে বিরোধীদেরকেও পাল্টা বার্তা দিচ্ছে। কারণ এগুলো নিয়ে অতীতে কটাক্ষ করেছিল বিরোধীরা।’
অর্থনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছে সরকার। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সরকার যা বলছে :
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের কর্মসূচি নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে মোট ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা সরকারের প্রশাসনিক গতিশীলতার বড়ো প্রমাণ বলেই উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের মাধ্যমে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
মুখপাত্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে 'কৃষক কার্ড' চালু করা হয়েছে।
এছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় 'পদ্মা ব্যারাজ' প্রকল্পসহ দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এক্ষেত্রে, মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি তদারকির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এসআর







