• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

আইএমএফের সংস্কার চাপ, মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত জনগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৩ মে ২০২৬, ১০:০৯ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত

চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে।

বাংলাদেশকে ভর্তুকিনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক মূল্যব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছিল সংস্থাটি। কিন্তু চলমান বাস্তবতায় আইএমএফের চাপ উপেক্ষা করে ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার।

জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অর্থ বিভাগের প্রাথমিক বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মোট বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে হিসাবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় আগামী বছরও সরকারের ব্যয়চাপ কমার সম্ভাবনা নেই। তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ঋণচুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

এই শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করে। এতে কিছুটা ভর্তুকি কমানো সম্ভব হলেও বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির সময় বর্তমানের মতো বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল না। এখন একই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

আগামী বাজেটেও সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় আগামী বছর ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ, উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম আবারও বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

এই বাস্তবতায় আগামী বাজেটে এলএনজি খাতে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিখাতে ভর্তুকি কমাতে রাজি নয় সরকার। কারণ সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আগামী বাজেটে সারে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা যাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

একই সঙ্গে ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু রাখতে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের চিন্তা করছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট করার সুযোগ নেই।

রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতেও আগামী অর্থবছরে নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, রফতানি প্রণোদনায় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে প্রণোদনা বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া পাটজাত পণ্যে সহায়তায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তায় নগদ ঋণ বাবদ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী উচ্চ ভর্তুকি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। যদিও সরকার এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় চেয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে হঠাৎ ভর্তুকি কমিয়ে দিলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আইএমএফের সব শর্ত বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার ভাষায়, সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নীতিগত সমন্বয় থাকলেও সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো শর্ত অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করা হবে না।

অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি কমানো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও বর্তমান বাস্তবতায় হঠাৎ ভর্তুকি প্রত্যাহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে বাজারের সব পণ্যে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ।

তিনি বলেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে শুধু দাম বাড়ানোই সমাধান নয়; বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, সিস্টেম লস, মিটার টেম্পারিং ও চুরি বন্ধ করলেও সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, গত দেড় দশকে জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অপচয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সেই অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কিংবা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার এক ধরনের ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’র বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে আইএমএফের সংস্কার চাপ, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত জনগণ। ফলে সরকার এমন একটি ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে আন্তর্জাতিক ঋণ কর্মসূচিও সচল থাকবে, আবার সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপও পড়বে না।

তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ভর্তুকি ও সহায়তা ব্যয় বাড়তে থাকলে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

ভিওডি বাংলা/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
১০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এলো ১২৮ কোটি ডলার
১০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এলো ১২৮ কোটি ডলার
সরকার বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: বাণিজ্যমন্ত্রী
সরকার বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: বাণিজ্যমন্ত্রী
জ্বালানি সংকট সমাধান ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে না
বিডা চেয়ারম্যান জ্বালানি সংকট সমাধান ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে না