গাজীপুরে ফাইভ মার্ডার
হত্যার আগে সন্তানদের জন্য চকলেট, চিপস কেনেন ফোরকান

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে গৃহবধূ ও তাঁর তিন মেয়েসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া এখনো পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ওই রাতে দুই সন্তান নিয়ে বাসার পাশের একটি দোকানে গিয়ে চিপস, চকলেট কিনেছিলেন ফোরকান।
যে বাড়িতে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়, সেই বাড়ির পাশেই চা-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করেন আবদুর রশিদ। রোববার (১০ মে) দুপুরে তিনি জানান, শনিবার ভোরে পাঁচজনের লাশ পাওয়া যায়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে ছোট মেয়ে ফারিয়াকে কোলে নিয়ে ও উম্মে হাবিবার হাত ধরে তাঁর দোকানে এসেছিলেন অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া। বাচ্চাদের জন্য দোকান থেকে চকলেট, চিপস কেনেন।
আবদুর রশিদ জানান, রাত ১০টার মধ্যে তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। এর পরে কোনো কিছু তাঁর জানা নেই।
স্থানীয় লোকজন জানান, রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ওই বাড়িতে এসেছিলেন ফরেনসিক বিভাগের সদস্যরা। তাঁরা সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে গেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শ্রাবণী বলেন, এই ঘটনা একা কেউ ঘটিয়েছে বলে মনে হয় না। আমি খবর শুনে ঘরের ভিতর গিয়ে বীভৎস পরিস্থিতি দেখেছি। একটি ঘরে বিছানার পাশে জানালার গ্রিলে শারমিনকে দুই হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। শরীরে নতুন শাড়ি। মুখে টেপ প্যাঁচানো, মুখের বেশিরভাগ কালো কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো, পিঠের পেছনে দেয়ালে রক্তের দাগ। এমন হত্যাকাণ্ড জীবনে দেখিনি।
শনিবার (৯ মে) সকালে গৃহবধূ, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে ওই নারীর স্বামী পলাতক। পুলিশের ধারণা, স্বামী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার, শারমিনের মেয়ে মীম খানম, উম্মে হাবিবা, ফারিয়া ও ভাই রসুল মিয়া। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়াকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরি গোপীনাথপুর গ্রামে। ফোরকান প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে কাপাসিয়ার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ফোরকান প্রাইভেটকার চালাতেন। আর তাঁর শ্যালক রসুল মিয়া গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় কাজ করতেন।
নিহত শারমিনের ফুফু ইভা আক্তার বলেন, ফোরকান তাঁর ভাই মিশকাতকে কল দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’ খবর পেয়ে তাঁরা পাঁচ-ছয়জন সকালে ঘটনাস্থলে যান। গিয়ে দেখেন, ভবনের গেট খোলা। নিচতলার কক্ষগুলোর দরজাও খোলা। ভেতরে গিয়ে তাঁরা পাঁচজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানানো হয়। একই সঙ্গে তাঁরা কাপাসিয়া থানায় যান।
ইভা আক্তারের দাবি, ফোরকান আরেকটি বিয়ে করবেন বলে শারমিনকে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে শারমিন মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। ছয়-সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে মারধর করেন। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়। পরে তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সুস্থ হওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। কয়েক দিন পর ফোরকান আবার স্ত্রীকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। তবে দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ চলছিল। শারমিন স্বামীকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সন্তানদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান।
লাশগুলোর পাশ থেকে গোপালগঞ্জ সদর থানা বরাবর করা অভিযোগের মতো একটি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এতে কোনো স্বাক্ষর নেই। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান জানান, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা জিডি তাঁর থানায় হয়নি।
কম্পিউটারে টাইপ করা ওই চিঠি থেকে জানা গেছে, ৩ মে ফোরকান মিয়া থানায় ওই অভিযোগ করেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী, শ্বশুরসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই কাগজে লেখা রয়েছে, শ্বশুর তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে কয়েক দফায় তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এছাড়া স্ত্রী তাঁর এক স্বজনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় শ্বশুর ও অন্যরা মিলে তাঁকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেন।
নিহত শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘আমাদের জানামতে, ফোরকান সম্প্রতি তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাননি। তাঁকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার মনে হয়, তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন অভিযোগ লিখেছেন।’
এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাপাসিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) যুবায়ের আহমেদ জানান, মূল আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে পাওয়া অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/এফএ







