দেশজুড়ে হামের প্রকোপ
৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে এবার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বাড়ছে। এছাড়াও যারা এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি তারাও রয়েছে ঝুঁকিতে।
এদিকে, দেশজুড়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর হাড়ও। বিশেষ করে টিকার আওতার বাইরে থাকা অল্পবয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হওয়ায়, শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি প্রাদুর্ভাবের শুরু ১৫ মার্চ থেকে। এই সময়ের মধ্যে সারা দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৬৭ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৯২ জন। হাম ও এর উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট ২১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিদিনই নতুন করে শত শত শিশু সংক্রমণের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এতে করে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চাপ। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে, যা এই রোগের উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতার দিকটি সামনে নিয়ে আসছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এরইমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে চার সপ্তাহব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে চার সপ্তাহব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, শুধু টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। সবশেষ ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশ শিশু টিকার প্রথম ডোজ এবং ৮১ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজ পেলেও একটি বড় অংশ এখনো সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।
গত তিন বছরে টিকা না পাওয়া বা অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। সে হিসাবে প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাচ্ছে এবং একটি বড় অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।
আরো উৎকণ্ঠার বিষয় হলো, অনেক শিশু টিকার নির্ধারিত বয়স হওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে করে তারা টিকার সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না এবং সংক্রমণের একটি ধারাবাহিক চক্র তৈরি হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশে হামের প্রার্দুভাব নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, “এখন আমরা যে চিত্র দেখছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক শিশু টিকার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। এর একটি কারণ হলো জন্মের পর অনেক শিশু মায়ের কাছ থেকে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পাচ্ছে না। ফলে তারা খুব অল্প বয়সেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।
পাশাপাশি যেসব এলাকায় টিকাদানের কভারেজ কম, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে না, বরং আমাদের টিকাদান কৌশল আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।”
তিনি আরো বলেন, “যদি অরক্ষিত শিশুদের সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব বারবার ফিরে আসতে পারে। তাই দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।”
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে খুব দ্রুত অনেক শিশু আক্রান্ত হতে পারে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে তার সংস্পর্শে আসা প্রায় সবাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত শনাক্তকরণ পদ্ধতি প্রয়োজন।”
তিনি আরো বলেন, “অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিশুর জ্বর, ফুসকুড়ি বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
ভিওডি বাংলা/এসআর







