স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা দীর্ঘায়িত

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হলেও এখনো নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সরকারি নির্দেশনার অভাবে নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অপেক্ষা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা না আসায় কমিশন মূলত অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় সামগ্রিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণও সম্ভব হচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি সামনে আসে। সে সময় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে নির্বাচন আয়োজনের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোয় ব্যাপক রদবদল ঘটে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয়। এর ফলে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৪ হাজার ৬৫৩টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি সরকার ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রশাসক নিয়োগের এ সিদ্ধান্ত বৃহৎ পরিসরের নির্বাচন আয়োজনকে আরও কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে। কারণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হলেও নির্বাচন আয়োজনের তাগিদ কমে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই ধারণা করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে। কারণ এই স্তরের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সহজ এবং দ্রুত আয়োজন করা সম্ভব। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য স্তরের নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং প্রস্তুতি অপরিহার্য। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনগত প্রক্রিয়া-সবকিছু সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন। তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আয়োজন করলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
সম্ভাব্য পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। তবে এ জন্য সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সময় নষ্ট করা হচ্ছে না। এখন মূল বিষয় হলো কোন স্তরের নির্বাচন দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে, সেটি নির্ধারণ করা।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে কোনো আইনবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নীতিগত অবস্থানের মধ্যেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, অল্প সময়ের মধ্যেও নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/জা







