• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

বৈশাখে কমছে পান্তা-ইলিশের জৌলুস

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৮ এ.এম.
পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য এখন অনেকের নাগালের বাইরে-ছবি-ভিওডি বাংলা

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন একসময় ছিল উৎসবমুখর এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ভোরের আলো ফোটার আগেই নগরের পার্ক, সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মানুষের ঢল নামত। লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত মানুষের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত চারপাশ। এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পান্তা-ইলিশ, যা ধীরে ধীরে বৈশাখ উদযাপনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পাল্টেছে। এখনও বৈশাখ উদযাপিত হয়, কিন্তু পান্তা-ইলিশকে ঘিরে আগের মতো উন্মাদনা আর দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি এখন প্রতীকী আয়োজন কিংবা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ইতিহাস বলছে, পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য খুব পুরোনো নয়। গ্রামীণ বাংলায় পান্তা ভাত ছিল সাধারণ মানুষের খাবার, আর ইলিশ ছিল উৎসবের মাছ। নব্বইয়ের দশকের পর শহুরে সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের প্রভাবে এই দুইয়ের সংমিশ্রণ বৈশাখের জনপ্রিয় অংশ হয়ে ওঠে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ খাওয়া এক ধরনের সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই ধারায় বড় পরিবর্তন এনেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে ইলিশ মাছের দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। একটি মাঝারি ইলিশ কিনতে যে ব্যয় প্রয়োজন, তা অনেক পরিবারের জন্য কষ্টকর। পাশাপাশি চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে পান্তা-ইলিশ আয়োজন অনেকের কাছে বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রজন্মগত পরিবর্তনও এই রূপান্তরের একটি বড় কারণ। নতুন প্রজন্ম বৈশাখকে এখন ভিন্নভাবে দেখে। তাদের কাছে এটি খাবারের চেয়ে অভিজ্ঞতার উৎসব। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করাই হয়ে উঠছে প্রধান আকর্ষণ। ফলে পান্তা-ইলিশ খাওয়া আর বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগে মানুষ সরাসরি অংশ নিয়ে উৎসব উপভোগ করলেও এখন অনেকেই অনলাইনে যুক্ত থাকে। ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ বাড়ায় বাস্তব মিলনমেলার পরিসর কিছুটা কমেছে, যা সমবেতভাবে পান্তা-ইলিশ উপভোগের ঐতিহ্যে প্রভাব ফেলছে।

একই সঙ্গে সামাজিক বন্ধনেও এসেছে পরিবর্তন। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কারণে বড় পরিসরের আয়োজন কমে গিয়ে পরিবার বা ছোট পরিসরে উদযাপন বাড়ছে।

পান্তা-ইলিশের বাণিজ্যিকীকরণও এর জনপ্রিয়তা কমার একটি কারণ। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় উচ্চমূল্যের বৈশাখী প্যাকেজ অনেকের নাগালের বাইরে থাকায় এটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে পরিবেশগত কারণেও ইলিশের সরবরাহ ও দাম প্রভাবিত হচ্ছে। নদীর দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত আহরণের কারণে বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেকেই বিকল্প খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। পান্তার সঙ্গে ভর্তা, শুটকি বা দেশি ছোট মাছ দিয়ে উদযাপন বাড়ছে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পান্তা-ইলিশের জৌলুস কমলেও বৈশাখের চেতনা হারিয়ে যায়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎসবের ধরন বদলাচ্ছে। নতুন পোশাক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো-এসবের মধ্য দিয়েই এখন বৈশাখ উদযাপন নতুন রূপে ফিরে আসছে।

ভিওডি বাংলা/জা
 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বর্ষবরণে গান-নৃত্যে মুখর ঢাবির বটতলা
বর্ষবরণে গান-নৃত্যে মুখর ঢাবির বটতলা
কৃষক কার্ড উদ্বোধনে টাঙ্গাইলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
কৃষক কার্ড উদ্বোধনে টাঙ্গাইলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
চারুকলা থেকে ঢোল-বাদ্যে বৈশাখী শোভাযাত্রা
চারুকলা থেকে ঢোল-বাদ্যে বৈশাখী শোভাযাত্রা