গ্রামবাংলা থেকে ভুলে যাচ্ছে বাংলা সন, মাস ও তারিখ

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলা সন, মাস ও তারিখ। অথচ আধুনিকতার প্রবল স্রোতে এবং ইংরেজি ক্যালেন্ডারের আধিপত্যে আমাদের শিকড়ের এই অনুষঙ্গটি আজ বিলুপ্তির পথে।
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নতুন সূর্যোদয় হতো বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে। কৃষকের লাঙল ধরা থেকে শুরু করে ঘরের মা-বোনদের পিঠাপুলির উৎসব—সবই চলত বাংলা তারিখ মেনে। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামীণ জনপদ থেকেও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে বাংলা সনের ব্যবহার। এখন পহেলা বৈশাখ কিংবা নবান্নের মতো গুটিকয়েক উৎসব ছাড়া সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা তারিখের খোঁজ রাখা যেন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগেকার দিনে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা আঙুল গুনে বলে দিতে পারতেন আজ বাংলার কত তারিখ। হালখাতা, নবান্ন, পৌষ সংক্রান্তি কিংবা মেলা—সবই হতো বাংলা মাস ও তিথি মেনে। কৃষকরাও বীজ বপন কিংবা ফসল কাটার সময় নির্ধারণে বাংলা পঞ্জিকার ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং স্মার্টফোনের ব্যবহারের ফলে ইংরেজি তারিখই এখন সবার প্রধান অবলম্বন। সরকারি-বেসরকারি সকল দাপ্তরিক কাজে ইংরেজি তারিখ বাধ্যতামূলক হওয়ায় সাধারণ মানুষও এখন বাংলা মাস বা তারিখ মনে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না।
বর্তমানে বাংলা সনের ব্যবহার কেবল পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। পান্তা-ইলিশ আর বৈশাখী মেলা শেষে পরের দিন থেকেই আবার শুরু হয় ইংরেজি তারিখের রাজত্ব। গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারগুলোতেও এখন আর আগের মতো বাংলা পঞ্জিকা বিক্রির ধুম পড়ে না। অনেক তরুণ প্রজন্মের কাছে আশ্বিন, কার্তিক কিংবা মাঘ মাসের নামগুলোও এখন অপরিচিত মনে হয়।
বাংলা সন মূলত ছিল একটি কৃষিভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। কর আদায়ের সুবিধার্থে এবং ঋতুচক্রের সাথে মিল রেখে এর প্রচলন শুরু হয়েছিল। বাংলা নববর্ষের বর্তমান রূপটির সূচনা মূলত মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে।
সেই সময় মোগলরা কর আদায়ের জন্য হিজরি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। কিন্তু হিজরি ক্যালেন্ডার চন্দ্র মাস হওয়ার কারণে তা এদেশের কৃষিপঞ্জির সঙ্গে মিলত না। ফলে কৃষকদের ফসল কাটার সময়ের আগেই কর দেওয়ার চাপ সৃষ্টি হতো।
এই সমস্যা দূর করতে সম্রাট আকবর তার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি হিজরি ও সৌর পঞ্জিকার সমন্বয়ে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে 'বঙ্গাব্দ' বা বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এটি কার্যকর করা হয়েছিল আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে।
অথচ আজ গ্রামের প্রান্তিক কৃষকরাও সারের দোকান কিংবা সরকারি দপ্তরে গিয়ে ইংরেজি তারিখেই সব হিসাব নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকাটি আজ ঘরের কোণের ক্যালেন্ডারেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
জেলার চৌগাছা উপজেলার বাড়ীয়ালী গ্রামের সনাতন ধর্মালম্বী সত্তরর্ধ্বো কেতু সরকার বলেন, "আমার বাড়িতে এখনও বাংলা পঞ্জিকা রাখা হয় এবং সেটা দেখে আমাদের সারা বছরের হিসাব পরিচালনা করা হয়। জেলার শার্শা উপজেলার গোকর্ণ গ্রামের পঁচাত্তর বছর বয়সী জাহিদা বেগম ভিওডি বাংলাকে জানান, ইংরেজি সাল, তারিখ গণনা করলেও পাশাপাশি বাংলা মাস, তারিখ হিসাব রেখে কাজ করেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার বয়স্ক মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা ইংরেজি সন, তারিখের পাশাপাশি বাংলা মাস ও তারিখের হিসাব রাখেন। তবে বাংলা কত সন চলছে এ হিসাব অধিকাংশ মানুষই জানেন না। হিসাবের দিক থেকে গ্রামগঞ্জের বয়স্ক নারীরাই বাংলা মাস, তারিখ হিসাব রেখে বেশি কাজ করেন।
বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজন তরুণ-তরুণীর কথা বলে জানা যায়, তারা সর্বোচ্চ সংখ্যক নবীন প্রজন্ম বাংলা তারিখ, মাস ও সনের হিসাব রাখেন না। এদের অনেকে বাংলা বার মাসের নাম বলতে পারলেও কোন মাস, কত তারিখ, কোন সন, বাংলা কোন ঋতু এ সম্পর্কে জানা নেই। অনেকে ছয়টি ঋতুর নাম বলতে পারলেও ধারাবাহিকভাবে বলতে পারেনা।
সব কিছুই মিলায়ে শহরের পাশাপাশি যশোর জেলার গ্রামগঞ্জের তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে কালের পরিক্রমায় ভুলে যেতে বসেছে বাংলা সন, তারিখ, মাস ও ঋতু।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, একটি জাতির আত্মপরিচয় টিকে থাকে তার ভাষা ও ঐতিহ্যের ওপর। বাংলা তারিখের এই বিস্মৃতি আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়েরই নামান্তর। তারা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পারিবারিক পরিসরে বাংলা সনের চর্চা না বাড়লে অদূর ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম বাংলা মাসগুলোর নামও হয়তো ভুলে যাবে।
সকল সরকারি ও বাণিজ্যিক চিঠিপত্রে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা তারিখ ব্যবহার করা। গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে বাংলা তারিখ প্রচার করা।
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের বাংলা বারো মাসের নাম ও সন গণনার পদ্ধতি শেখানো।
গ্রামীণ মেলা ও লোকজ উৎসবগুলোকে আরও বেশি বাংলা পঞ্জিকা নির্ভর করে গড়ে তোলা।
বাংলা সন ও তারিখ কেবল সংখ্যা নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের পরিচয়। বিশ্বায়নের এই যুগে টিকে থাকতে হলে আধুনিকতাকে যেমন গ্রহণ করতে হবে, তেমনি নিজের শিকড়কেও আঁকড়ে ধরতে হবে। গ্রামবাংলা থেকে যদি বাংলা তারিখ হারিয়ে যায়, তবে তা হবে আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক বিশাল পরাজয়। তাই এখনই সময় বাংলা সনের চর্চাকে পুনরায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার।







