নেপথ্যে সিটিগ্রুপসহ চার প্রতিষ্ঠান
জ্বালানী সংকটের মধ্যে ভোজ্যতেলে কারসাজি

জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সংকট পুঁজি করে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটগুলো তৎপর হয়ে ওঠে মাস খানেক আগে থেকেই। কিন্তু সরকার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি না হওয়ায় এ সুযোগ হাতছাড়া হলে ভিন্ন ছকে এগোয় কালোবাজারি চক্র। বাজারে ভোজ্যতেলে অস্থিরতা সৃষ্টির কৌশল হিসেবে তারা শুধু দেশের অভ্যন্তরে মজুদ করাই নয়- চক্রগুলো প্রতিবেশী দেশে সয়াবিন তেল পাচারের চেষ্টা করছে। যা রুখতে সীমান্তে পাহাড়া ও নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবি।
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রাথমিক কার্যক্রম হিসেবে ভোজ্যতেল সংশ্লিষ্ট শিল্পগ্রুপগুলো তাদের বিক্রয়কর্মীদের মাধ্যমে সয়াবিনের দাম বাড়বে বলে কিছুদিন ধরে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের মধ্যে ছড়াতে থাকে। যে বিষয়ে সরকারকে আগাম সতর্ক করে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
সরকার নজরদারি বাড়ালেও চক্রটি বাজার অস্থির করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভোজ্যতেল পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে- যা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। যা ঠেকাতে মাঠে নামানো হয়েছে বিজিবি সদস্যদের। তারা সীমান্ত এলাকায় বৃহস্পতিবার (৯এপ্রিল) মহড়া দিয়েছে এবং কড়া তল্লাশি চালিয়েছে বলে বিজিবি সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আসন্ন পহেলা বৈশাখ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব যাচাইকালে গত সপ্তাহে ভিওডি বাংলা নিত্যপণ্যের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে কারসাজির তথ্য পায়। এক বিক্রেতা তথ্য দেন যে, ভোজ্য তেল সয়াবিনের দাম বাড়ানো হবে বলে সেলসম্যানরা তেল কোম্পানিগুলোর বরাত দিয়ে বলে গেছে। এর দুদিন পর বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তেল সরবরাহ কমে গেছে।
এদিকে তেল কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকটের আড়ালে কলকাঠি নাড়ছে বলে এই বিক্রেতার ভাষ্যে উঠে আসে। যা আরো অন্তত ১৩ জন বিক্রেতা স্বীকার করেছেন। তবে তেল সরবরাহকারী শিল্পগ্রুপগুলো বলছে সেই পুরনো গদবাধা কথা, ‘আমরা আগের দামেই তেল সরবরাহ করছি।’
অন্যদিকে, তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত পেয়ে এক সপ্তাহ ধরে ভোজ্যতেল মজুদ করছে নানাভাবে। অর্থাৎ- পরিকল্পিতভাবে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম সংকটে যুক্ত হচ্ছে বা মদদ দিচ্ছে।
একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ভোজ্যতেল নিয়ে কারসাজি সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারকে আগাম সতর্ক করে প্রতিবেদন পাঠায়।
একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট গোপন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান দৃশ্যমান থাকায় একাধিক চক্র ভোজ্যতেল প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করে দেশের অভ্যন্তরে অস্তিরতা আরও বৃদ্ধি করতে চায়।
সংশ্লিষ্ট শিল্পগ্রুপগুলো ও বাজার সিন্ডেকেট এবং সীমান্তসহ সম্ভাব্য স্থানে নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয় এসব প্রতিবেদনে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে রাঙ্গামাটির সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক এলাকায় ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুত ও চোরাচালান প্রতিরোধে তৎপরতা জোরদার করেছে বিজিবির বাঘাইহাট ব্যাটালিয়ন (৫৪ বিজিবি)। তল্লাশি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটালিয়ন গেটে প্রবেশ ও বহির্গমনকারী যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন ফারুকী ভিওডি বাংলাকে বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোজ্য তেলের অবৈধ মজুত ও চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত তল্লাশি কার্যক্রম এবং টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু সিন্ডিকেট, অসাধু ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অনৈতিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং ডলার সংকটের অজুহাত দেখিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির কোনও বৈধ কারণ নেই। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নিজে বাজারে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।
বেসরকারি ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, বোতলজাত সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত দাম ১৭০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ১৮৫ টাকার খোলা সয়াবিন ও ১৬২ টাকার পাম অয়েলের দামও বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিরতার মূল কারণ হলো সরবরাহ চেইন সিন্ডিকেট। শীর্ষ কয়েকটি কর্পোরেট গ্রুপ আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে বাজারে ইচ্ছাকৃত সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে। বোতলজাত ও খোলা তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বাজারে প্রতি লিটারে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দাম না মেনে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো সয়াবিন ও পাম অয়েল বিক্রি করছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়েছে। তদারকির ঘাটতি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অসাধু চক্র বারবার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের পর সরবরাহ সংকট, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম অভাবের কারণে হঠাৎ সয়াবিন তেলের বাজার অস্থির হয়েছে। বোতলজাত তেল উধাও হওয়ায় খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম আরও বাড়ানোর জন্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, ফলে প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, বাজার অস্থিরতা কাটাতে তারা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- সরকার নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেল বিক্রি নিশ্চিত করা; সিন্ডিকেট চক্রকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া; মজুতদারির বিরুদ্ধে নিয়মিত কঠোর অভিযান পরিচালনা; অস্বাস্থ্যকর নন-ফুড গ্রেড ড্রামে তেল বিক্রি বন্ধ করা।
চট্টগ্রামে র্যাব ২২ হাজার ৬৪২ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করেছে এবং দুই প্রতিষ্ঠানকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মজুতদারির ঘটনা ধরা পড়েছে।
বাজারে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। খোলা তেল কিনতে ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছেন, যা সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। ঈদের পর থেকে অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা গণমাধ্যমকে বলেন, অপকৌশলের মাধ্যমে বাজার অস্থির করার অভিযোগ সঠিক নয়। বৈশ্বিক সংকট ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে আমরা সরকার নির্ধারিত দামে সরবরাহ নিশ্চিত করছি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান জানান, বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এসআর







