আমাদের দায়িত্ব এখনও শেষ হয়নি

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্কুলজীবনেই প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এ দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি। এক টুকরো শান্তনা এনে দিতে পেরেছি মুক্তিযুদ্ধে ছেলে হারা, স্বজন-সম্ভ্রমহারা মায়ের শোকার্ত ভেঙে যাওয়া বুকে। আমি মুক্তিযোদ্ধা—এ আমার চিরগর্ব, চিরশক্তি, চিরস্বস্তি।
জানি- স্বাধীনতা অর্জন হলেও আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। তরুণ প্রজন্ম- এই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব এখন তোমাদের কাঁধে। স্বাধীনতা আমরা এনে দিয়েছি সত্যি—কিন্তু স্বাধীনতার স্বার্থকতা দেখি তোমাদের চোখে, আগামী প্রজন্মের চোখে, আজকের শিশু, তরুণ বা যুবকের চোখে।
তরুণরা, তোমরা স্বাধীনতার ইতিহাসকে ভুলন্ঠিত করতে দিও না, মুছে ফেলতে দিও না আমাদের এই রক্তের দাগ, স্বেচ্ছায় জীবন দিয়ে এ ইতিহাস লেখা। তোমরা রক্ষা করো প্রকৃত ইতিহাস, রক্ষা করো স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত শহীদদের নাম।
আমি গর্বিত—কারণ ৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশ এসেছে, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও একজন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের গড়া দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), নতুন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে হাসি ফুটেছে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো দয়া বা আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। এটি ছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, সাহসিকতা এবং একনিষ্ঠ আত্মত্যাগের ফল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাত আমাদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী দাগ কেটে দিয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়—রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলসহ অসংখ্য স্থানে নিরীহ মানুষ নিহত হয়। সেই রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কখনো সহজে আসে না, এবং এটি রক্ষাও সহজ নয়।
স্বাধীনতার আগে বাঙালির ওপর দীর্ঘ দিনের বৈষম্য চাপানো হতো। ১৯৪৭ সালের পর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য আমাদের জীবনকে সীমিত করেছিল। ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির সংগ্রাম স্বাধীনতার প্রতি এক অটুট সংকল্পের প্রতীক ছিল। প্রতিটি আন্দোলন আমাদেরকে স্বাধীনতার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই যাত্রা রক্তক্ষয়ী ও বেদনাদায়ক ছিল।
ছাত্রজীবনেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে যুক্ত হই। অস্ত্র না থাকলেও ছাত্ররা বিভিন্নভাবে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিত, এমনকি স্কুলের ল্যাব থেকে রাসায়নিক সংগ্রহ করে বোমা তৈরির চেষ্টা করা হতো। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ চোখে দেখার পরই শপথ নেই—দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।
স্বাধীনতার পরও আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। আমরা যে দেশটি অর্জন করেছি, তা শুধু সীমারেখা বা প্রশাসনিক কাঠামো নয়। এটি হলো আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, মানুষ এবং ন্যায়পরায়ণ সমাজের প্রতীক। আমাদের দায়িত্ব হলো এই স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা, প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা। জাতীয় ঐক্য, মেধা, সততা ও সৃজনশীল চিন্তাধারা—এই চারটি উপাদানেই আমাদের দেশকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
আজকের বিশ্বায়িত সমাজে বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। প্রতিভা ও প্রযুক্তি ছাড়া কোনো জাতি শক্তিশালী হতে পারে না। তাই তরুণ প্রজন্মকে তাদের মেধা দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। মেধা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং দেশপ্রেম একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বিশ্বমানের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের চ্যালেঞ্জ। আমাদের তরুণদেরকে অনুপ্রাণিত করতে হবে, যাতে তারা স্থানীয় ও বৈশ্বিক উভয় মঞ্চে দেশের মর্যাদা এবং পরিচয় রক্ষা করতে সক্ষম হয়। শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ন্যায়পরায়ণ, সমৃদ্ধ ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ।
স্বাধীনতা চিরন্তন, কিন্তু এটি রক্ষা করা আমাদের কাঁধের দায়িত্ব। যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ অর্জন করেছিলেন, তাদের আত্মত্যাগকে ভুলে গেলে জাতি দুর্বল হয়ে যায়। আমাদের দায়িত্ব শুধুমাত্র স্মৃতিচারণ নয়, বরং সেই স্মৃতিকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে দেশের জন্য কাজ করা। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি উদ্যোগ এবং প্রতিটি নৈতিক সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যতকে শক্তিশালী করবে।
আজকের প্রজন্মের কাছে আহ্বান—তোমরা সেই শহীদদের প্রতিজ্ঞা ধরে রাখো। তোমাদের হাতেই স্বাধীনতার রক্ষা এবং দেশের উন্নয়ন নির্ভর করছে। দেশপ্রেম, মেধা, সততা এবং সাহস—এই চারটি অনুষঙ্গের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চিরকাল রক্ষা পাবে। আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি; এটি আজও আমাদের হাতে রয়েছে। ইতিহাস আমাদের চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, আর আমরা সেই চ্যালেঞ্জে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
আমাদের দায়িত্ব শুধু সীমাবদ্ধ নয়। এটি হলো একটি চিরস্থায়ী প্রতিশ্রুতি—মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো, নতুন প্রজন্মকে দেশের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বমানের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, কিন্তু এটি রক্ষা করা, দেশকে উন্নয়নের উচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়া এবং জাতিকে শক্তিশালী করা—এই চূড়ান্ত লক্ষ্য আজও আমাদের হাতে।
আজকের দিনে আমাদের সকলকে স্মরণ রাখতে হবে—স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। সেই বীরত্বের চেতনা, দেশপ্রেম এবং ন্যায়পরায়ণ মনোভাবকে আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে বাধ্য। নতুন প্রজন্মকে দেশ, সংস্কৃতি, মানুষ এবং ঐতিহ্য রক্ষা করতে শেখানোই হচ্ছে আমাদের প্রধান কর্তব্য। এই দায়িত্ব কখনো শেষ হবে না, কারণ স্বাধীনতা চিরন্তন, এবং এটি রক্ষার দায়িত্ব চিরকাল আমাদের।
মুছতে দিও না আমাদের জীবন দেওয়ার ইতিহাস আর এই রক্তের দাগ।
মনে রেখো- সবার আগে বাংলাদেশ।
লেখক: সম্পাদক, ভিওডি বাংলা
প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
ভিওডি বাংলা/আরআর







