মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে আটকে পড়া জাহাজেই ঈদের নামাজ বাংলাদেশি নাবিকদের

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রনালীতে আসতে না পেরে দূরে পারস্য উপসাগরে নোঙর করে আছে দীর্ঘদিন। এর মধ্যে এসে পড়েছে ঈদ। পারস্য উপসাগরের যে অঞ্চলে জাহাজটি বাংলাদেশি নাবিকদের নিয়ে অবস্থান করছে, সে দেশে আজ শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। তাই নাবিকরা জাহাজেই ঈদের নামাজ জামাতে আদায় করেন। তবে কবে তারা দেশে ফিরতে পারবেন জাহাজ নিয়ে, সে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের জলসীমায় থাকা জয়যাত্রা’র নাবিকরা শুক্রবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজের ডেকে নামাজ পড়তে পারেননি। জাহাজের ভেতরে ‘প্যাসেজে’ ঈদের নামাজ আদায় করেন তারা।
সংযু্ক্ত আরব আমিরাতে শুক্রবার ঈদ উদযাপিত হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ নিয়ে সেখানেই আছেন বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের ৩১ নাবিক।
গুরুত্বর্পূণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় থাকা জাহাজটি হামলার শঙ্কায় শারজাহ বন্দর থেকে ৮০ নটিক্যাল দূরে নোঙ্গর ফেলে আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ৩১ বাংলাদেশি নাবিকের সবাই একপ্রকার ‘আতঙ্কের’ মধ্যে দিন পার করছেন। তবু ঈদ উদযাপনে শামিল হয়েছেন তারা।
‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা সবাই মিলে ঈদের নামাজ আদায় করেছি। এখানে আজ সকালে বৃষ্টি হয়েছে।
“তাই ডেকের উপরে নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। আমরা জাহাজের ২৯ জন মুসলিম নাবিক ও ক্রু প্যাসেজে নামাজ পড়েছি। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। পরে সবাই মিলে ছবিও তুলেছি।”
তিনি বলেন, “আমরা ঈদের জামাতে এই পরিস্থিতিতে যাতে দ্রুত মুক্তি পাই, সেজন্য সবাই মিলে দোয়া করেছি।”
জয়যাত্রার নাবিকদের তোলা ছবিতে দেখা যায়, প্রায় সবাই ঈদের দিন পাঞ্জাবি পড়েছেন। জাহাজের ডেকে এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তারা ছবি তুলেছেন।
ঈদ উদযাপনের মধ্যে দেশে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে নাবিক ও ক্রুরা কথা বলেছেন বলে জানান ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম।
বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি পরবর্তী গন্তব্যের অপেক্ষায় ৯ দিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের জলসীমায় বসে আছে।
পরিবার-স্বজনদের উৎকণ্ঠার মধ্যে নাবিক জীবনের অভিজ্ঞতায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও তাদের টিকে থাকতে হচ্ছে। জাহাজে প্রতিদিনকার নিয়মিত কাজ প্রত্যেক নাবিককে করে যেতে হচ্ছে।
তাদের পরিস্থিতি জানিয়ে একদিন আগে বৃহস্পতিবার ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, “আমাদের মাথার উপর দিয়ে প্রতিদিন শত শত ড্রোন বা মিসাইল উড়ে যাচ্ছে। কখন কোথায় আঘাত হানবে, তার কোনো ঠিক নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মনোবল শক্ত রাখাই আমাদের প্রধান কাজ।
“আমাদের নাবিক জীবন সবসময়ই কষ্টের, দীর্ঘ সময় ধরে গভীর সমুদ্রে জাহাজে অবস্থান করতে হয়। এজন্য আমাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া থাকে। সেজন্য যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও কীভাবে সময় পার করতে হবে তা আমাদের জানা রয়েছে।”
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে আসে এমভি বাংলার জয়যাত্রা। পরদিন ওই বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে জাহাজটি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়।
টার্মিনালে ভেড়ার একদিন পরেই জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানরত জাহাজটির দুইশ মিটার দূরে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটির ৩১ নাবিকের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়।
পণ্য খালাস শেষে জাহাজটি পুনরায় কাতারে ফিরে যাবার কথা থাকলেও ‘জয়যাত্রা’কে ভাড়াকারী (চার্টার) প্রতিষ্ঠান পরবর্তী গন্তব্য মুম্বাই বন্দর ঠিক করে। পরবর্তী গন্তব্যের জন্য জাহাজটি হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওনা দেয়।
কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড তাদের যাত্রা আটকে দেয় নিরাপত্তার কথা বলে। জাহাজটি দিক ঘুরিয়ে শারজাহ বন্দর থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সমুদ্রে বন্দরের জলসীমায় অবস্থান নেয়।
ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার চুক্তি অনুসারে দেশে রোজার ঈদ পালন করার কথা ছিল না। হয়তো অন্য কোনো গন্তব্যে আমরা থাকতাম।
“কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আটকে থেকে জাহাজেই ঈদ পালন করতে হচ্ছে।”
ভিওডি বাংলা/আরআর







