ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের দুই শীর্ষ নিরাপত্তা নেতা

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র-এই ত্রিমুখী সংঘাত এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার পথে। হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় প্রতিদিনই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই বড় ধরনের ধাক্কা খেল তেহরান-একই হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান ও উপ-প্রধান।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) গভীর রাতে ইসরায়েলের লক্ষ্যভেদী হামলায় নিহত হন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সচিব আলী লারিজানি এবং উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েত। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। দেশটির বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজও একই তথ্য জানিয়েছে।
প্রথমদিকে ইসরায়েল দাবি করেছিল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে তারা লারিজানিকে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে জানানো হয়, ওই হামলায় লারিজানি, তার ছেলে এবং একজন সহকারী নিহত হয়েছেন। কিছু সময় পর নিশ্চিত হওয়া যায়, নিহত সেই সহকারীই ছিলেন পরিষদের উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েত।
এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করে নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানায়, লারিজানি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি বিপ্লব ও দেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন এবং দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ‘শাহাদাত’ বরণ করেছেন। তাকে দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক নেতার মর্যাদা দেওয়া হয়।
এই হামলা এমন এক সময় ঘটল, যখন ইরান ইতোমধ্যেই বড় ধরনের সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার মৃত্যুর পর থেকেই পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
তেহরান এরপর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে থাকে। এই প্রতিশোধমূলক অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
লারিজানি ও বায়েতের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই হামলার ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়া হবে। আইআরজিসি ইতোমধ্যেই পাল্টা হামলা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ দুই ব্যক্তিকে একসঙ্গে হারানো কৌশলগতভাবে বড় আঘাত। তবে একই সঙ্গে এটি ইরানকে আরও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আলী লারিজানি ছিলেন ইরানের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। একই সঙ্গে তিনি পরিষদে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করছিলেন।
লারিজানি ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ইরানের সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে কাজ করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি প্রিন্সিপলিস্ট গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাকে মধ্যপন্থি রক্ষণশীল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তার ভাই সাদেঘ লারিজানি-ও ইরানের আরেক প্রভাবশালী নেতা, যিনি এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
অন্যদিকে আলীরেজা বায়েত সম্পর্কে ইরানি গণমাধ্যমের ভাষ্য-তিনি ছিলেন দক্ষ কিন্তু প্রচারবিমুখ প্রশাসক। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ইরানের হজ ও তীর্থযাত্রা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। ৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানা ২১ দিন আলোচনা চলে। তবে কোনো সমঝোতা ছাড়াই সেই সংলাপ শেষ হয়।
এর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ইসরায়েল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ চালু করে। এই যৌথ অভিযানের প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হন খামেনি এবং ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।
ভিওডি বাংলা/জা







