• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

ডিএসসিসির রাজস্ব আয়ে ভাটা, নেপথ্যে কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৪ মার্চ ২০২৬, ০২:২৬ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

তিলোত্তমা ঢাকা গড়ার কারিগর হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং আধুনিক নগরকাঠামো বিনির্মাণে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চিরকালই অগ্রগণ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থাটির সেই কর্মতৎপরতার ছন্দে কিছুটা পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত রাজস্ব আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

আয়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতা কেবল দাপ্তরিক জটিলতাই বাড়ায়নি, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক সেবার ওপর। একদিকে যেমন দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থের অভাবে অনিশ্চয়তার সুঁতোয় ঝুলছে জনগুরুত্বপূর্ণ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প। সেবা আর সংগতির এই ভারসাম্যহীনতা ডিএসসিসির অগ্রযাত্রাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এইদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর গত প্রায় দেড় বছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুই মাসে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে, অর্থাৎ নির্বাচনের মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৪২ কোটি টাকা। অথচ কয়েক বছর আগেও নিয়মিতভাবে মাসে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হতো বলে কর্মকর্তারা জানান।

রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয় ২০২৩–২৪ অর্থবছরে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের ওই বছরে সংস্থাটি ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজস্ব আদায় না বাড়ায় ওই সময় জমা থাকা অর্থ থেকেই গত ১৮ মাস ধরে ব্যয় মেটাতে হয়েছে। ফলে তহবিলে চাপ বাড়তে থাকে।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গত দেড় বছর উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ নিয়েই বেশি তোড়জোড় হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা এখন সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রমকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অর্থসংকটের পেছনের কারণ:

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর তড়িঘড়ি করে বিপুল পরিমাণ উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সাবেক মেয়রদের সময় আটকে রাখা বিলগুলো কম সময়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের কমিশন-বাণিজ্য ব্যবহারের অভিযোগ আছে।

গত ১৯ মাসে উন্নয়নকাজের বিল হিসেবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তবে অনেক প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী তা পরিশোধ সম্ভব নয়।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন–ভাতা এবং পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। বর্তমানে সাধারণ তহবিলে আছে মাত্র ১৬ কোটি টাকা।

প্রধান রাজস্ব খাতেও ঘাটতি

ডিএসসিসির সবচেয়ে বড় তিনটি রাজস্ব উৎস হলো-হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি এবং বাজার ও সম্পত্তি ইজারা। এর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ইজারা, পার্কিং ইজারা, জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন ফি এবং বিভিন্ন ধরনের সনদ ফি থেকেও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব খাত থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণ রাজস্ব আসছে না বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কর আদায়ে অনিয়ম, বকেয়া করের পরিমাণ বৃদ্ধি, তথ্য হালনাগাদের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রাজস্ব সংগ্রহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

নাগরিক সেবায় পড়ছে সরাসরি প্রভাব

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে নাগরিক সেবার ওপর। কারণ নগরের দৈনন্দিন সেবাগুলোর বড় অংশই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

রাজস্ব প্রবাহ কমে গেলে মশকনিধন কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ, স্ট্রিটলাইট পরিচালনা এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।

উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি হওয়ার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চলমান প্রকল্পের কাজ থেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় অথবা নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, নগর অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক সেবা সম্প্রসারণেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক কার্যক্রমে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)–এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান অর্থসংকট শুধু রাজস্ব ঘাটতির ফল নয়; এর পেছনে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বহু বছরের পুরোনো বকেয়া বিল-যার কিছু অনিয়ম বা ভুলের কারণে দীর্ঘদিন আটকে ছিল-সেগুলো কমিশন-বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সিটি করপোরেশন থেকে বেরিয়ে গেছে।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দেড় বছর ধরে উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ নিয়েই বেশি তোড়জোড় হওয়ায় সিটি করপোরেশনের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এর প্রভাব এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে এবং তা সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রমকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

সমাধানে প্রয়োজন সংস্কার

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে। হোল্ডিং ট্যাক্সের তথ্য হালনাগাদ, বকেয়া কর আদায়ে বিশেষ উদ্যোগ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর সংগ্রহ এবং রাজস্ব খাতগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে শুধু সিটি করপোরেশনের আর্থিক অবস্থাই শক্তিশালী হবে না, বরং রাজধানীর নাগরিক সেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ে ভাটা এখন কেবল একটি আর্থিক সংকট নয়; এটি রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবার ধারাবাহিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ঈদে গণপরিবহনে ভাড়া ও যাত্রী সুরক্ষায় বিশেষ তদারকি: ডিএমপি
ঈদে গণপরিবহনে ভাড়া ও যাত্রী সুরক্ষায় বিশেষ তদারকি: ডিএমপি
যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব পালন করলে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী
দায়িত্ব পালন করলে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী