ঢাকার ভোটার স্থানান্তরে ‘অস্বাভাবিক’ হিড়িক, সিটি নির্বাচনে নতুন সমীকরণ?

ঢাকার রাজনৈতিক মানচিত্রে এখন এক নতুন উদ্বেগের ছায়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই আলোচনা উসকে দিয়েছে ‘অস্বাভাবিক ভোটার স্থানান্তর’। অভিযোগ উঠেছে, রাজধানী ঢাকাকে টার্গেট করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিপুল পরিমাণ ভোটার স্থানান্তর করেছে। এই বিষয়টি কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, বরং আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনেও জয়-পরাজয়ের সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানের অন্তরালে রহস্যময় সংখ্যাতত্ত্ব
২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৭৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ এবং নারী ভোটার ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়:
ঢাকা-৮ আসন: রেকর্ড ৩ হাজার ৬৬৩ জন ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা-৫ আসন: ২ হাজার ৬৯৪ জন ভোটারের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে।
ঢাকা-৯ ও ১০ আসন: যথাক্রমে ২ হাজার ৬৩৪ এবং ১ হাজার ৮৪৭ জন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন।
ঢাকা-৪, ৬ ও ৭ আসন: এই আসনগুলোতেও ৮ শতাধিক থেকে শুরু করে ৯ শতাধিক ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একেকটি ওয়ার্ডে যেখানে ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য থাকে, সেখানে হাজার হাজার ভোটারের এই আকস্মিক অন্তর্ভুক্তি মূল নির্বাচনী ফলাফলকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে সক্ষম।
ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের অভিযোগ ও অনুসন্ধানী দাবি
ঢাকা-৬ সংসদীয় আসনে বিপুল পরিমাণ ভোটার স্থানান্তরের অভিযোগ তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তার দাবি অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি অশুভ চক্র ঢাকাকে লক্ষ্য করে এই ‘ভোট ব্যাংক’ তৈরির কাজ শুরু করে।
ইশরাক হোসেন আরও দাবি করেন, "আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্বাচনের এক মাসও পার না হতেই এই বহিরাগত ভোটারদের একটি বড় অংশ ওই আসন থেকে আবারও অন্যত্র চলে গেছে।" তিনি মনে করেন, এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বর্তমানে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ ও দালিলিক সংগ্রহের কাজ চলছে।
শীঘ্রই এই ‘অস্বাভাবিক’ প্রক্রিয়ার পেছনের কুশীলবদের নামসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দলের কাছে পেশ এবং জনসম্মুখে প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ‘অজ্ঞতা’ ও প্রশাসনিক উদাসীনতা
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নির্বাচন অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ভোটার স্থানান্তরে স্থানীয় ঠিকানার সত্যতা যাচাই করার কথা থাকলেও, এই বিশাল সংখ্যার ক্ষেত্রে সেই আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের অনুপ্রবেশ
ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের দাবির সপক্ষে আরও কিছু তথ্য এসেছে যে, ৫ আগস্টের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্পর্শকাতর ওয়ার্ডে ভোটার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো—ভোটের মাঠে সাধারণ ভোটারদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা এবং সিটি নির্বাচনে পোলিং এজেন্টের ঘাটতি পূরণ করা।
জনপদে জনমত
ভোটার স্থানান্তরের এই গুঞ্জন এখন পাড়া-মহল্লার চায়ের আড্ডায় প্রধান আলোচ্য বিষয়।
এলাকাভিত্তিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে মিশ্র ও উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া:
গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা সফিক বলেন, "গেন্ডারিয়া আমাদের নাড়ি পোঁতা এলাকা। এখানকার সুখ-দুঃখ আমরাই বুঝি। কিন্তু রাজনীতির হিসাব মেলাতে যদি বাইরের হাজার হাজার মানুষকে আমাদের ভোটার বানানো হয়, তবে আমাদের প্রকৃত ভোটাধিকার হরণ করা হবে। সিটি নির্বাচনে এর প্রভাব পড়লে স্থানীয় নেতৃত্বের মান উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।"
ঢাকা ৪ এলাকার এক জুরাইনবাসী ব্যবসায়ী আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "জুরাইনের ড্রেনেজ বা রাস্তার সমস্যা নিয়ে আমরা আন্দোলন করি। যারা হঠাৎ করে ভোটার হয়ে এল, তারা তো এই এলাকার অলিগলিও চেনে না। তাদের ভোট দিয়ে যদি আমাদের প্রতিনিধি ঠিক করা হয়, তবে জুরাইনবাসীর দুর্ভোগ কোনোদিন কমবে না। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।"
এদিকে ঢাকা ৬ পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ও যুবক জানান, "ঢাকা-৬ এর প্রাণভোমরা হলো নাজিরাবাজার। আমরা শুনতে পাচ্ছি এখানে বিপুল ভোটার পরিবর্তন হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে যে প্রক্রিয়ায় জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আসছে, তা যদি সত্য হয় তবে সিটি নির্বাচনে এর চড়া মাশুল দিতে হবে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন প্রতিটি ভোটার স্থানান্তরের আবেদন পুনরায় যাচাই করুক।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য
ভোটার স্থানান্তরের এই ‘গোপন হিড়িক’ যদি এখনই থামানো না যায়, তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। সচেতন মহলের দাবি, নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে একটি ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ বা ‘নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি’ গঠন করে গত ছয় মাসে হওয়া প্রতিটি ভোটার স্থানান্তরের আবেদন সরেজমিনে যাচাই করতে হবে।
তারা ধারণা করছেন, ঢাকাকে রাজনৈতিকভাবে কুক্ষিগত করতেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। যদি এই অস্বাভাবিক ভোটার স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা না হয়, তবে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাধারণ মানুষের রায়ের বদলে ‘কৃত্রিম ভোটার’দের রায়ই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এখন দেখার বিষয়, ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভিওডি বাংলা/খতিব/এমএস







