রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে অনুমোদনের পরও ৬৬ শ্রমিক চাকরি অস্থায়ী

রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ৬৬ জন মজুরিভিত্তিক শ্রমিকের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা আটকে গেছে। বোর্ডসভায় অনুমোদন পাওয়ার পরও তাদের চাকরি এখনও নিয়মিত করা হয়নি। এতে শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
শ্রমিকদের মধ্যে কেউ ২৮ বছর, কেউ ২১ বছর ধরে শিক্ষা বোর্ডে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনেও তাদের চাকরি নিয়মিত করা হয়নি।
এদিকে চাকরি নিয়মিত হওয়ার আশায় থাকা অবস্থায় গত শনিবার মনিরুল ইসলাম দুলাল নামে এক শ্রমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সহকর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরও চাকরি নিয়মিত না হওয়ায় মানসিক চাপেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মনিরুল ইসলাম ২৮ বছর ধরে বোর্ডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে ৬৬ জন নিয়োগ পান। তাদের পদ চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস। বর্তমানে তারা দৈনিক ৭৫০ টাকা মজুরি পান।
এর আগে বোর্ডে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া ৩৮ জন শ্রমিক আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাকরি নিয়মিত করেন। একই দাবিতে ২০১৪ সালে এই ৬৬ জন শ্রমিকও আদালতের দ্বারস্থ হন। সে বছর উচ্চ আদালত ৯০ দিনের মধ্যে তাদের চাকরি নিয়মিত করার নির্দেশ দেন। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ বাস্তবায়ন না করে আপিল করে। পরে ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ রায়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দেন এবং মানবিক কারণে এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক আ.ন.ম. মোফাখখারুল ইসলাম। শ্রমিকেরা তাঁর কাছে চাকরি নিয়মিত করার আবেদন জানান। পরে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বোর্ডের নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি গঠন করা হয়।
গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি শ্রমিকদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে তাদের চাকরি নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত হয় এবং বিষয়টি ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় অনুমোদন পায়। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর কাছে শ্রমিকেরা যোগদানপত্র জমা দেন। তবে এরপরও তাদের চাকরি নিয়মিত করা হয়নি।
শ্রমিকেরা জানান, যোগদানপত্র জমা দেওয়ার সময় সচিব তাদের বলেছিলেন মাসের অর্ধেক সময় তারা আগের নিয়মে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে পারিশ্রমিক পাবেন এবং বাকি সময় নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে বেতন পাবেন। কিন্তু মাস শেষে তারা জানতে পারেন, আগের মতোই পুরো মাসের মজুরি ছাড় করা হয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বোর্ডের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা বাইরে থেকে নিজেদের লোক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। চেয়ারম্যান এতে সম্মত না হওয়ায় শ্রমিকদের চাকরি নিয়মিত করার প্রক্রিয়া আটকে গেছে।মজুরিভিত্তিক শ্রমিক মোসাদ্দেক হোসেন জনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে সামান্য মজুরিতে কাজ করছি। আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও আমাদের চাকরি নিয়মিত হয়নি। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও একটি দুষ্টচক্রের কারণে নিয়োগ আটকে গেছে।”
আরেক শ্রমিক জাকারিয়া নয়ন বলেন, “বোর্ডসভায় অনুমোদন পাওয়ার পর সচিব আমাদের যোগদানপত্র নিয়েছেন। তারপরও চাকরি নিয়মিত হয়নি। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমাদের সহকর্মী মনিরুল ইসলাম দুলাল স্ট্রোকে মারা গেছেন।” এ বিষয়ে বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, “যোগদানপত্র শ্রমিকেরাই স্বপ্রণোদিত হয়ে জমা দিয়েছেন। আমরা তা চাইনি। আপাতত তাদের চাকরি নিয়মিত করা হচ্ছে না।”
তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ.ন.ম. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, “কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতা রয়েছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম, কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।”
ভিওডি বাংলা-মো. রমজান আলী/জা







