এলএনজি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ, জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান

টানা দুই দিন দরদাতা না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। সেটাও স্বাভাবিক দামের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয়ে।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতার থেকে নির্ধারিত দুটি এলএনজি চালান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই কার্গো সংগ্রহ করা হয়।
ভিটোলএশিয়া কার্গো প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৪.৫ ডলারে সরবরাহ করবে এবং গুনভর ২৮ ডলারে সরবরাহ করবে । যা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আগে যেখানে একটি চালান আনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লাগত, সেখানে এখন প্রতিটি চালানে ব্যয় হবে প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে সম্ভাব্য বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি মজুত সুরক্ষিত রাখতে সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে আতঙ্কে জ্বালানি কিনে মজুত না করার অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ দিনের পেট্রোল এবং ৩০ দিনের অকটেন মজুত রয়েছে। ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১২ দিনের।
সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৩৭ হাজার টন পেট্রোল এবং ৫৩ হাজার টন অকটেন মজুত রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কনডেনসেট থেকেও এসব জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
ডিপোগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে। এর বাইরে বন্দরে ইতোমধ্যে দুটি ডিজেলবাহী জাহাজ নোঙর করেছে, যেগুলোতে মোট ৫৭ হাজার টন ডিজেল রয়েছে।
সাধারণত দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়। তবে গত কয়েক দিনে তা বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার টনের বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বন্দর থেকে।
ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে কিছু বিঘ্ন ঘটলেও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বড় কোনো সমস্যা নেই। কোথাও কোথাও চালান আসতে কিছুটা দেরি হচ্ছে, তবে কোনো চুক্তি বাতিল হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা নেই। তবে আতঙ্কে বেশি মজুত
করায় চাপ তৈরি হচ্ছে। সবাইকে মজুত না করার আহ্বান জানাই।”
তিনি বলেন, বিদ্যমান মজুত দীর্ঘদিন ধরে রাখতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ বিষয়ে পৃথক নির্দেশনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সব সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনকে কঠোরভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনায় অপ্রয়োজনীয় আলো কম ব্যবহার, এয়ার কন্ডিশনার ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় চালানোসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, গ্যাস লিকেজ বন্ধ করা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে গণপরিবহন ও কারপুল ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে মন্ত্রী ও সচিবদের মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি একই ভবনে বসবাসকারী মন্ত্রী ও সচিবদের সচিবালয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যৌথভাবে গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনার আহ্বান জানান। সরকারি বৈঠকও কম আলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয় কার্যক্রমের অংশ।
এদিকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক স্থানে যানবাহনের লাইন পাম্প এলাকা ছাড়িয়ে সড়কে গিয়ে পৌঁছায়, ফলে সৃষ্টি হয় যানজট এবং ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নজমুল হক বলেন, “সারা দেশেই এখন একই পরিস্থিতি। আগে কোনো গাড়ি ১০ লিটার নিত, এখন পুরো ট্যাংক ভরছে। মোটরসাইকেলগুলোও আগের চেয়ে অনেক বেশি নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, এভাবে আতঙ্কে কেনাকাটা চলতে থাকলে সাধারণত এক মাসের জন্য রাখা জ্বালানি মজুতও ১০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।
তিনি আরও বলেন, “এরপর আমাদের জানানো হয়েছে যে গত বছরের মার্চ থেকে মে মাসের বিক্রির তুলনায় সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হবে।”
এলপিজি আমদানিকারকরা বৃহস্পতিবার প্রতিমন্ত্রী টুকুর সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়েছেন, এলপিজি আমদানিতে তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, বিশেষ করে এলসি খোলার ক্ষেত্রে।
তারা জানান, ১০ হাজার টন এলপিজি বহনকারী একটি জাহাজ শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি এলাকায় হামলার ঘটনার পর যাত্রা থামিয়ে দিয়েছে। আরেকটি জাহাজে ৩৫ হাজার টন এলপিজি দেশে আসছে, যা মার্চে নির্ধারিত ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। তবে পরিবহন খরচ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এলপিজির দাম বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানান আমদানিকারকরা।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী টুকু বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিবেচনা করবে। তবে ব্যবসায়ীদের নিজেদের সিদ্ধান্তে দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







