মনিরা শারমিন:
সরকারি চাকরিতে থেকেও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন

সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই-এমন স্পষ্ট বিধান রয়েছে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানে। তবে এসব বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা পদে বহাল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন দলটির প্রভাবশালী নারীনেত্রী মনিরা শারমিন-এমন অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি প্রায় ১০ মাস সরকারি চাকরিতেও বহাল ছিলেন। আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার সময়কাল হিসাব করলে প্রায় দেড় বছর তিনি সরকারি চাকরির বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘন, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আত্মপ্রকাশের পর দলটির ১৫১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ২১৭ সদস্যে উন্নীত করা হয়। ওই কমিটিতে দ্বিতীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মনিরা শারমিন। পরবর্তীতে তিনি দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বও লাভ করেন।
দল গঠনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এনসিপির পক্ষে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলন, টকশো, বিবৃতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায় তাকে। সংগঠক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে দলীয় কার্যক্রমে তার উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবেও দলটির মনোনয়ন পান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার জেনারেল পদে নিয়োগ পান মনিরা শারমিন। নিয়োগের পর তিনি প্রথমে কুষ্টিয়া শাখায় যোগ দেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলি হয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজার করপোরেট কার্যালয়ে আসেন।
এই সময় থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানা গেছে। অথচ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা সহায়তা করতে পারবেন না। এ ধরনের কার্যক্রম শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়।
একই ধরনের বিধান রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চাকরি প্রবিধানমালা ২০০৮-এ। ওই প্রবিধানের ৩৭(২) ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারণায় যুক্ত হতে পারবেন না এবং ব্যাংক বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রমে জড়াতে পারবেন না।
তথ্য অনুযায়ী, এসব বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ একই বছরের মার্চ মাসেই তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার পরও প্রায় ১০ মাস তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন।
এই সময়ে তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ব্যাংকের এক্সগ্রেশিয়া বোনাসও পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৫ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান মনিরা শারমিন। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। যদিও পরে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন সমঝোতার কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি অনেকের জানা থাকলেও তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে তিনি নিয়মিত অফিস করতেন না। তবে দলীয় প্রভাব ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন তোলেননি।
এ বিষয়ে মনিরা শারমিন বলেন, সরকারি চাকরির বিধি ভেঙে রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পরই তিনি চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। তবে হেড অফিস থেকে অনুমোদন পেতে সময় লাগে।
তিনি আরও বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি ছাড়ার মতো আর্থিক সচ্ছলতা তার ছিল না। তবে তিনি কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরির কোনো সুবিধা নেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার পর তিনি নিয়মিত অফিস করেননি এবং অধিকাংশ সময় ছুটিতে ছিলেন।
রাজনীতির জন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়াকে তিনি বড় ধরনের ত্যাগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হলে তা দুঃখজনক।
অন্যদিকে কারওয়ান বাজার শাখার উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন বলেন, মনিরা শারমিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এ বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। এমপি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি প্রথম এ বিষয়ে জানতে পারেন।
চাকরির পাশাপাশি রাজনীতি করা প্রবিধান লঙ্ঘন কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চাকরির পাশাপাশি রাজনীতি করার সুযোগ নেই। তবে তিনি কীভাবে তা করেছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।
এদিকে প্রশাসন ও আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি সরকারি চাকরি বিধিমালা ও ব্যাংকের প্রবিধান লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এবং ওই সময় নেওয়া বেতন-ভাতা ও বোনাস বৈধ ছিল কি না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী যথাযথ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা বা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ।
তার মতে, কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে সেটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সতর্কীকরণ, বেতন কমানো বা চাকরি থেকে বরখাস্তসহ বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিলেও চাকরিকালীন সময়ে সরকারের কাছ থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভিওডি বাংলা/জা







