• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

যেভাবে প্রাণ ফিরে পেলো রাজধানীর নগর ভবন

নিজস্ব প্রতিবেদক    ৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৩ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালামের দায়িত্ব গ্রহণের পরই বদলে যেতে শুরু করে চিত্র। তার যোগদানের পরপরই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, প্রশাসনিক জটিলতা, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও নানা বিতর্কে জর্জরিত রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)–এর প্রধান কার্যালয় নগর ভবন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে। কয়েক মাস ধরে সীমিত কার্যক্রম, ফাইলজট ও সেবা বিঘ্নে বিপর্যস্ত ছিল নগর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু এই ভবনটি। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা এবং সেবা কার্যক্রমে গতি আনার ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে আবারও সচল হয়ে উঠেছে পুরো দপ্তর।

প্রশাসক হিসেবে মো. আবদুস সালামের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে চিত্র। কয়েক মাসের ফাইলজট, সেবা বিঘ্ন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার পর এখন দপ্তরজুড়ে দৃশ্যমান গতি।

নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণ

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে মো. আবদুস সালামকে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে টানা ৪০ দিন বন্ধ ছিল নগর ভবনের প্রধান ফটক—যা নগর প্রশাসনের অচলাবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

দায়িত্ব নিয়েই তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেন। কোথায় কত ফাইল আটকে আছে, কোন সেবায় কতদিন ধরে জট—এসবের তালিকা প্রস্তুত করে তা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।

ফাইলজট নিরসনে সময়সীমা

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সপ্তাহেই গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। একসময় যেখানে অনুমোদনের অপেক্ষায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যেত, এখন সেখানে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত অনুমোদন—সব ক্ষেত্রেই গতি এসেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

অফিস কক্ষগুলোতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা, ফাইল আদান-প্রদান ও সরাসরি নাগরিক সেবা কার্যক্রমে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি এখন দেখা যাচ্ছে কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতি ও তদারকি।

জবাবদিহি ও শৃঙ্খলায় জোর

নগর ভবনের করিডোর, যা একসময় নীরব ছিল, এখন সেখানে কর্মচাঞ্চল্যের আবহ। বায়োমেট্রিক হাজিরা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। বিভাগভিত্তিক জবাবদিহি জোরদার হওয়ায় দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেবা গ্রহণে আগত নাগরিকদের সহায়তায় তথ্যকেন্দ্র সক্রিয় করা হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য আলাদা ডেস্ক চালু রয়েছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, নগর ভবনের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

উন্নয়ন প্রকল্পে তদারকি

শুধু দৈনন্দিন সেবা নয়, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক মেরামত ও জলাবদ্ধতা নিরসন—এসব খাতে সমন্বয় সভা বাড়ানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কাজেও তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

প্রশাসকের অঙ্গীকার ও কর্মপরিকল্পনা

দায়িত্ব গ্রহণের পর আব্দুস সালাম মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ‘ক্লিন ও গ্রিন ঢাকা’ গড়ে তোলা এবং নাগরিক সেবাকে গতিশীল করার অঙ্গীকার করেছেন। তার প্রধান পরিকল্পনাগুলো হলো—

মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম; মশক প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর অভিযান।

নাগরিক সেবা গতিশীলকরণ: স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা।

জবাবদিহিতা: দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা গাফিলতি বরদাস্ত না করার ঘোষণা; পেশাদারিত্বে জোর।

সবুজ ও আধুনিক ঢাকা: পরিবেশ উন্নয়ন, খাল খনন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগর গড়া।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি: মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

তিনি সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি জনগণের হারানো আস্থা ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া

সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ভোগান্তির পর এখন অনেকেই নগর ভবনে এসে তুলনামূলক দ্রুত ও সংগঠিত সেবা পাচ্ছেন বলে জানাচ্ছেন।

পুরান ঢাকার জুতা ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, “আগে একটি ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে অন্তত তিন-চারবার আসতে হতো। কখনো ফাইল পাওয়া যেত না, কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা থাকতেন না। সময়, ভাড়া আর কাজ—সবকিছুতেই ক্ষতি হতো। এখন নির্ধারিত কাউন্টারে কাগজ জমা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এখন কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।”

তিনি আরও জানান, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে লাইসেন্স নবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে দেরির কারণে ব্যাংকিং কার্যক্রম ও সরবরাহ চুক্তিতেও জটিলতা তৈরি হতো। বর্তমানে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমেছে বলে তার অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে এক নারী সেবাগ্রহীতা, যিনি তার সন্তানের জন্মনিবন্ধন সংশোধনের জন্য এসেছিলেন, তিনি জানান একটি বানান সংশোধনের জন্যও বহুদিন অপেক্ষা করতে হতো। বারবার এসে খোঁজ নিতে হতো। এবার আবেদন জমা দেওয়ার পর দ্রুত যাচাই হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এতে সময় ও মানসিক চাপ—দুটোই কমেছে।

এমন অভিজ্ঞতা শুধু এই দু’জনের নয়; নগর ভবনে আসা আরও অনেক নাগরিকই বলছেন, আগের তুলনায় সেবার গতি বেড়েছে এবং কর্মকর্তাদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও পুরোপুরি সমস্যামুক্ত বলা যাচ্ছে না; তবু পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নাগরিক আস্থা আরও দৃঢ় হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সেবাগ্রহীতাদের।

দৃশ্যমান পরিবর্তন

এদিকে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও এসেছে পরিবর্তন। ভবনের ভেতরে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, দর্শনার্থীদের জন্য অপেক্ষাকক্ষ ও তথ্য নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নজরদারিও জোরদার হয়েছে।

৪০ দিনের বন্ধ ফটক পেরিয়ে নতুন উদ্যমে জেগে ওঠা নগর ভবন এখন রাজধানীর নাগরিক সেবায় নতুন প্রত্যাশার প্রতীক। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কিনা—সেটিই বড় প্রশ্ন। নাগরিকদের প্রত্যাশা, এই গতি ও শৃঙ্খলা যেন সাময়িক না হয়ে স্থায়ী রূপ পায়, আর ডিএসসিসি হয়ে ওঠে দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব নগর প্রশাসনের মডেল।

ভিওডি বাংলা/খতিব আসলাম/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
রাজধানীতে আজ যেসব কর্মসূচি
রাজধানীতে আজ যেসব কর্মসূচি
উত্তরায় রেস্টুরেন্টে আগুন: দগ্ধ ৭ জনকে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি
উত্তরায় রেস্টুরেন্টে আগুন: দগ্ধ ৭ জনকে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি
গুলিস্তানে ২ কাটা হাত উদ্ধার, ফিঙ্গারপ্রিন্টে মিলল পরিচয়
গুলিস্তানে ২ কাটা হাত উদ্ধার, ফিঙ্গারপ্রিন্টে মিলল পরিচয়