• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

এক বান্দার আত্মসমালোচনা, প্রত্যাবর্তন ও প্রতিশ্রুতির গল্প

রবের চাওয়ায় আমি যেমন

মুহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবিব    ২ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৫ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

আমি এই পৃথিবীতে এসেছি আমার ইচ্ছায় নয়, আমার রবের ইচ্ছায়। তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমাকে জীবন দিয়েছেন, আমাকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। আমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস তাঁর দান, আমার প্রতিটি সকাল তাঁর রহমত। কিন্তু কখনো কি আমি ভেবে দেখেছি—আমার রব আমাকে যেমন দেখতে চান, আমি কি সত্যিই তেমন হতে পেরেছি?

এই প্রশ্নটি যখন আমার হৃদয়ে জাগ্রত হয়, তখন আমার আত্মা নীরব হয়ে যায়। আমি নিজেকে দেখি—আমার কাজ, আমার অবহেলা, আমার ভুল, আমার গাফলতি। আমি বুঝতে পারি, আমার রব আমার কাছে খুব বেশি কিছু চান না। আমার ধন-সম্পদ, বাহ্যিক সৌন্দর্য তিনি চান না। আল্লাহ চান আমার অন্তরের পবিত্রতা, আমার ইবাদতের আন্তরিকতা ও ইখলাস।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।” (আল-কুরআন)

হাদিসে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, “হে মু‘আয! তুমি কি জানো, বান্দাদের উপর আল্লাহর কী হক রয়েছে? এবং আল্লাহর উপর বান্দাদের কী হক রয়েছে?” তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই এ বিষয়ে সর্বাধিক অবগত। তখন রাসূল (সা.) বললেন, “বান্দাদের উপর আল্লাহর হক হলো তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দাদের হক হলো, যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না।”

কোরআনের এ আয়াত ও হাদিস আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য দুনিয়ার সাফল্য নয়, বরং আমার রবের সন্তুষ্টি। কিন্তু কত আফসোস! কত সময় দুনিয়ার পেছনে নষ্ট করছি, তাঁর হক নষ্ট করেছি, রবের ডাকে সাড়া দিইনি বা দেরি করছি। তিনি আমাকে ডাকেন—“আসো, আমার দিকে ফিরে আসো।” কিন্তু আমি এতটাই ব্যস্ত নিজের ইচ্ছা নিয়ে। আমার রব আমাকে ভালোবাসেন—আমি ভুলে যাই, তবুও তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেন। আমি দূরে সরে যাই, তবুও তিনি আমার ফিরে আসার পথ খোলা রাখেন। তাঁর রহমত এত বিশাল যে, আমি যদি এক কদম এগিয়ে যাই, তিনি আমার দিকে বহু কদম এগিয়ে আসেন। কিন্তু আমি কি সেই ডাকে সাড়া দিয়েছি? আমি কি সত্যিই তাঁর হতে পেরেছি?

আমি যখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনের দিকে তাকাই, তখন আমি রবের চাওয়ার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। তিনি ছিলেন রবের সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, তবুও তিনি সবচেয়ে বেশি ইবাদত করতেন, বেশি কাঁদতেন এবং সবচেয়ে বেশি বিনয়ী ছিলেন। তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল শুধু তাঁর রবের সন্তুষ্টির জন্য। আর আমি? আমি তাঁর উম্মত হয়েও কত দূরে রয়েছি সেই পথ থেকে!

এই উপলব্ধি আমার হৃদয়কে যন্ত্রণা দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে আমাকে আশা দেয়। কারণ আমার রব নিরাশ করেন না। তিনি তাওবার দরজা বন্ধ করেন না। আমি যদি সত্যিই তাঁর দিকে ফিরে আসি, তিনি আমাকে গ্রহণ করবেন। তিনি আমাকে নতুন করে গড়ে তুলবেন।

আজ আমি আমার হৃদয়ের গভীর থেকে একটি প্রতিজ্ঞা করছি—আমি আমার রবের চাওয়ায় নিজেকে গড়ব, ইনশা-আল্লাহ। আমি কোরআন ও সুন্নাহকে আমার জীবনের পাথেয় বানাব।

আমি আমার অন্তরকে পবিত্র করব। আমার প্রতিটি কাজের আগে চিন্তা করব—এতে কি আমার রব সন্তুষ্ট হবেন?

আমি জানি, এই পথ সহজ নয়। শয়তান বাধা দেবে, দুনিয়া আমাকে বিভ্রান্ত করবে, আমার নফস আমাকে ধোঁকা দেবে। কিন্তু আমার রব আমার সাথে আছেন। তিনি আমাকে সাহায্য করবেন, যদি আমি সত্যিই তাঁর হতে চাই।

হে আমার রব, তুমি আমাকে যেমন দেখতে চাও, আমাকে তেমন বানিয়ে দাও।
হে আমার রব, তুমি আমার অন্তরকে পবিত্র করে দাও।
হে আমার রব, তুমি আমাকে তোমার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।

আমার পরিচয় দুনিয়ার কোনো উপাধি নয়। আমার প্রকৃত পরিচয়—আমি তোমার বান্দা।

আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হবে যেদিন আমার রব আমার দিকে তাকিয়ে বলবেন— “হে আমার বান্দা, আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট।”

সেদিনই আমি সত্যিকার অর্থে হব—রবের চাওয়ায় আমি যেমন।

একজন আত্মশুদ্ধিকামী সচেতন বান্দার সবচেয়ে বড় দোয়া হওয়া উচিত—হে আল্লাহ, আমাকে আপনার পছন্দের বান্দা বানিয়ে দিন।

আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখক, গবেষক, আধ্যাত্মিক রাহবার ও প্রিন্সিপাল (মাদরাসা দারুল আমান আল ইসলামিয়া) ঢাকা।

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
রমজানকে স্বাগত জানানোর ৫ উপায়
রমজানকে স্বাগত জানানোর ৫ উপায়
সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি: ধর্ম উপদেষ্টা
সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি: ধর্ম উপদেষ্টা
নামাজের সময়সূচি - ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নামাজের সময়সূচি - ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬