ঢাকার ইফতারের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে বেইলি রোড

ঢাকার ইফতার সংস্কৃতির বহু বছরের পরিচিত মানচিত্র এখন বদলে যাচ্ছে। একসময় ইফতারের নাম মানেই ছিল পুরান ঢাকার চকবাজার, কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং আধুনিক পরিবেশনায় বেইলি রোড এখন সমানে সমান প্রতিযোগিতা করছে। ভোজনরসিকদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে ইফতারের ‘নতুন রাজধানী’।
বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে হালিম, খাসির রোস্ট, গরুর রেজালা এবং মোরগ পোলাওর সুবাসে মাতোয়ারা ক্রেতারা ভিড় করেন বেইলি রোডে। ফলস্বরূপ এখানে তৈরি হয়েছে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রমজানের ৯ম দিন, বেইলি রোডের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে সাজানো হয়েছে অভিজাত ও বৈচিত্র্যময় ইফতারি সামগ্রী। চিকেন কাবাব, হালিম, ফালুদা, দই বড়া, ফিরনি, পরোটা, রোল, কাটলেটসহ বিভিন্ন আইটেম ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বিকেল নামতেই ফুটপাত ও রেস্তোরাঁর সামনের অংশে ভিড় বাড়তে শুরু করে।

পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
নবাবী ভোজের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী জানান, তারা নতুন কিছু করছেন না, বরং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আইটেমগুলোই আধুনিক পরিবেশনায় উপস্থাপন করছেন। “মানুষ এখন শুধু স্বাদ নয়, নিরাপত্তাও দেখে। এখানে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন সবই নিয়ন্ত্রিতভাবে হয়, গরম খাবার গরমই পাওয়া যায়,” তিনি বলেন।
দামের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ভালো মানের মাংস, ঘি ও মসলা ব্যবহারের কারণে কিছুটা দাম বেশি। “তবু ক্রেতারা মান বুঝে বারবার ফিরে আসেন। আগে সবাই বলত ইফতার মানেই চকবাজার। এখন অনেকেই বলেন, একবার বেইলি রোড ঘুরে দেখি। এই পরিবর্তনটাই বড় কথা।”

ক্রেতাদের দৃষ্টিকোণ
মায়ের সঙ্গে ইফতার কেনার জন্য বেইলি রোডে এসেছেন রাকিবুল ইসলাম। তিনি জানান, “পুরান ঢাকার ইফতারের উত্তেজনা আলাদা। কিন্তু যানজট ও ভিড়ের কারণে সেখানে যাওয়া সময়সাপেক্ষ। এখানে অন্তত স্বস্তিতে দাঁড়ানো যায়।”
মঞ্জুর এলাহী নামের ক্রেতা বলেন, “বেইলি রোডে অনেক ভ্যারাইটি পাওয়া যায়। হ্যাঁ, দাম বেশি, তবে পরিষ্কার পরিবেশ ও বৈচিত্র্য মানুষকে এক জায়গায় সব কিছু কেনার সুযোগ দেয়।”

বেইলি রোডের বিখ্যাত ‘এ ওয়ান ফুড’ ঘুরে দেখা যায় এখানে প্রায় ৩০ প্লাস আইটেম রয়েছে। এর মধ্যে চিকেন ড্রামস্টিক ৮০ টাকা, কিমা পরোটা ১৫০ টাকা, ওয়েস্টার কাবাব ৮০ টাকা, ভেজিটেবল কাটলেট ৫০ টাকা, চিকেন অন্থন ৪০ টাকা, পেঁয়াজু ও বেগুনি ১০ টাকা, ফিশ বল ৯০ টাকা, জালি কাবাব ৭০ টাকা, চিকেন আচারী কাবাব ১০০ টাকা, চিকেন মালাই কাবাব ১২০ টাকা, বারবিকিউ চিকেন রোল ১৬০ টাকা, চিকেন অনিয়ন রোল ১৫০ টাকা, স্পাইসি চিকেন ৮০ টাকা ও চিকেন ললিপপ ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া এই দোকানে দই বড়া ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, ফালুদা ৮০ টাকা, গাজর ফিরনি ৮০ টাকা এবং হালিম ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে কাচারি বাড়ি ইফতার বাজারে মোরগ পোলাও ২৮০ টাকা, গরুর তেহারি ৩৫০ টাকা, খাসির রেজালা (হাফ কেজি) ১,২০০ টাকা ও এক কেজি ২,৪০০ টাকা, গরুর লাল ভুনা ১ কেজি ১,৬০০ টাকা এবং কালা ভুনা ১ কেজি ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঘি পরোটা ১০০ টাকা, আলু পরোটা ৮০ টাকা, লেমন মিন্ট ২২০ টাকা ও মহব্বতি শরবত ২৮০ টাকা।
কাচারি বাড়ি ইফতার বাজারেও মোরগ পোলাও ২৮০ টাকা, গরুর তেহারি ৩৫০ টাকা, খাসির রেজালা (হাফ কেজি) ১,২০০ টাকা ও এক কেজি ২,৪০০ টাকা।

হালিমপ্রেমীদের ভিড়
শফিকুল ইসলাম, একজন নিয়মিত ক্রেতা বলেন, “প্রায় দশ বছর ধরে রমজানে এখান থেকে হালিম কিনি। এখন লাইনে দাঁড়াতে হয়, স্বাদে একই মান বজায় থাকে।”
ছুটির দিনে বিক্রয় দ্বিগুণ
বিক্রয়কর্মী সবুজ মিয়া জানান, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি ভালো। তবে ছুটির দিনে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে, অনেক সময় আগেভাগেই কিছু আইটেম শেষ হয়ে যায়।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আর বেইলি রোডের আধুনিকতা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে ঢাকার ইফতারের নতুন সংস্কৃতি। স্বাস্থ্য সচেতন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বৈচিত্র্যময় খাবারের অভিজ্ঞতা মানুষকে এই নতুন ‘ইফতারের রাজধানী’-তে আকৃষ্ট করছে।
ভিওডি বাংলা/জা







