চলতি মাসে ৯ বার ভূমিকম্প

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ প্লেটগুলোতে অস্বাভাবিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাত্র ২৬ দিনে নয়বার কম্পন অনুভূত। উৎপত্তিস্থল এখন দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়। দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও নরম মাটির কারণে ছোট কম্পনও বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। এই ধারাবাহিক কম্পন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ৩.৭। উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম রাজ্য, যা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী।
গতকাল বুধবার রাতেও ৫.১ মাত্রার মাঝারি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চল, মনিওয়া শহর থেকে ১১২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং মাওলাইক শহর থেকে ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দেশজুড়ে ভূমিকম্পের একটি ধারাবাহিক চিত্র ফুটে উঠেছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের দক্ষিণ-পূর্বে ৩ মাত্রার কম্পন দিয়ে মাস শুরু হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মিয়ানমারে উৎপত্তিস্থল ধরে পরপর দুইবার কম্পন অনুভূত হয়। একই দিনে ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে।
৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় সিলেট অঞ্চলে ৩.৩ ও ৪ মাত্রার কম্পন আঘাত হানে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে ৪.১ মাত্রার আরেকটি কম্পন অনুভূত হয়। এইভাবে ফেব্রুয়ারির প্রথম ২৬ দিনে মোট নয়বার কম্পনের সাক্ষী হলো দেশবাসী।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল কারণ হলো ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। আগে বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতো। কিন্তু গত বছরের ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর দেখা যাচ্ছে, উৎপত্তিস্থল এখন দেশের অভ্যন্তরে, যেমন নরসিংদীর মাধবদী, সাভারের বাইপাইল ও ঢাকার বাড্ডা। এটি নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটগুলো অত্যন্ত সক্রিয়।
ভূতত্ত্ববিদরা জানাচ্ছেন, ছোট ছোট কম্পনগুলো সাধারণত জমে থাকা শক্তি আংশিক মুক্ত করে। তবে দীর্ঘ সময় বড় শক্তি মুক্ত না হলে তা ভবিষ্যতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে, তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি বরাবরই বেশি।
ঢাকা ও আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জাতীয় প্রস্তুতি এবং ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, নিয়মিত মহড়া এবং নাগরিক সচেতনতা জরুরি। বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি এবং দ্রুত সংস্কার অবশ্যক। দেশের প্রস্তুতি বর্তমানে মূলত ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রকৃতি বারবার সংকেত দিচ্ছে। এখনই জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার ভূ-তাত্ত্বিক গঠন এবং জনসংখ্যা বিবেচনা করে, ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করা এখন অতি জরুরি।
বাংলাদেশের নাগরিকদেরও সতর্ক থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এড়িয়ে চলা এবং জরুরি সময়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট কম্পনগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না, কারণ এরা বড় বিপদের পূর্বাভাস দিতে পারে।
ভিওডি বাংলা/জা







