• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
টপ নিউজ
চুক্তির মেয়াদ শেষের আগেই সরে দাঁড়াতে পারেন আইজিপি রমজান মাসজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ হাইকোর্টের নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন স্পিকার ও পররাষ্ট্রসচিব বিজয়-রাশমিকার বিয়ে: নেটফ্লিক্সের ৮১ কোটি টাকার প্রস্তাব নাকচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়নি: তথ্য উপদেষ্টা পবিত্র রমজান উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কি নতুন ভারসাম্যে ফিরবে? যুবকের ফাঁদে যুবতী সর্বস্বান্ত, আদালতে মামলা মাদক নিয়ে বিরোধ: ছেলেকে জখম ও পিতাকে কুপিয়ে হত্যা যুবদল নেতার দোকান ভাঙচুর, জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি গ্রেপ্তার

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কি নতুন ভারসাম্যে ফিরবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:০২ পি.এম.
তারেক রহমান-ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই জয়ের পরপরই আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভারতের পক্ষ থেকে এসেছে পরিমিত কিন্তু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক আরও জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

মোদির বার্তায় গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। তবে এই শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যেও স্পষ্ট-দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।  

নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা ও দিল্লির সতর্ক উষ্ণতা

নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর ভারতের প্রতিক্রিয়াকে বিশ্লেষকরা বলছেন “সতর্ক উষ্ণতা”। প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার বার্তা থাকলেও দিল্লি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছে। কারণ, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারত গমন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। সীমান্ত ইস্যু, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বাধা, ভিসা জটিলতা এবং পরিবহন যোগাযোগ কমে যাওয়ার মতো নানা কারণে সম্পর্ক শীতল পর্যায়ে পৌঁছায়।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে, যা ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশেও প্রভাব ফেলছে।

পুরোনো অবিশ্বাসের ইতিহাস

ভারত-বিএনপি সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট সরকার গঠন করে, তখন দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা-এই তিনটি বিষয় তখন ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০০৪ সালে চট্টগ্রামে বিপুল অস্ত্র চালান আটকের ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়। একই সময়ে প্রস্তাবিত বড় বিদেশি বিনিয়োগও নীতিগত জটিলতায় আটকে যায়। পরবর্তীতে কূটনৈতিক সৌজন্য নিয়েও টানাপোড়েন দেখা যায়, যা পারস্পরিক আস্থার ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে।

এই পটভূমির কারণে দিল্লি দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর কৌশলগতভাবে নির্ভর করেছে-বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির প্রশ্নে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নতুন সুযোগ

লন্ডনের SOAS University of London–এর অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি আঞ্চলিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। তার মতে, ভারতের জন্য সামনে এগোনোর ক্ষেত্রে এটি “নিরাপদ বাজি” হতে পারে-যদি পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা যায়।

তিনি বলেন, সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে আগ্রহ দেখানো সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ মাঠপর্যায়ে রয়েছে জনমত, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং মিডিয়ার প্রভাব-যা দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

দিল্লিভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েকের মতে, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে বহুমুখী সম্পর্ক রাখতেই পারে। পাকিস্তান বা চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লেই তা ভারতের জন্য হুমকি-এমন সরল সমীকরণে বিষয়টি দেখা ঠিক নয়। তবে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণতা: নতুন সমীকরণ

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দৃশ্যত উষ্ণ হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর সরাসরি ফ্লাইট চালু, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং নিরাপত্তা সংলাপ-এসব পদক্ষেপ আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।

এক সমাবেশে তারেক রহমানের “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়-বাংলাদেশ সবার আগে” বক্তব্যটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এতে তিনি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবমুক্ত স্বতন্ত্র নীতির ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি সংবেদনশীল হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন-বাংলাদেশ যদি বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করে, সেটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় আচরণ।

শেখ হাসিনা ইস্যু: কূটনীতির জটিল পরীক্ষা

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে প্রত্যর্পণ না করা-এই বিষয়টি ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, মানবাধিকার অভিযোগ এবং বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্ন-সব মিলিয়ে এটি সংবেদনশীল ইস্যু।

ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের কার্যক্রম ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও নজরে রাখছেন বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন-ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো দলকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা হলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

উসকানিমূলক বক্তব্য ও জনমতের প্রভাব

ভারতের কিছু রাজনীতিবিদ ও টেলিভিশন মাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য দুই দেশের জনগণের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে-এমন অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, দিল্লি সবসময় সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে দেখে না-এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাস্তবতায় উভয় পক্ষকেই বক্তব্যে সংযম দেখাতে হবে। কূটনীতিতে প্রতীকী আচরণ-যেমন সফর, আমন্ত্রণ, যৌথ বিবৃতি-এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা: স্থায়ী ভিত্তি

সব টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো সম্পর্কের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। যৌথ সামরিক মহড়া, সীমান্ত সমন্বয়, নৌ টহল এবং প্রতিরক্ষা সংলাপ নিয়মিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারতের দেওয়া ঋণ সুবিধাও চালু রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সরকার পরিবর্তন হলেও এই সহযোগিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না। কারণ এটি উভয় দেশের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

অর্থনীতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক-এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার।

পরিবহন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সংযোগ প্রকল্প-এসব ক্ষেত্রেও পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

সামনে পথ: কে নেবে প্রথম উদ্যোগ?

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই প্রথম এগিয়ে আসা উচিত। নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত ও বাস্তবভিত্তিক সংলাপ শুরু করলে আস্থা গড়ে তোলা সহজ হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে জনমত ও আঞ্চলিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের শুরুতেই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক এক নতুন পরীক্ষার মুখে। অতীতের অবিশ্বাস পেছনে ফেলে বাস্তবসম্মত সহযোগিতার পথে হাঁটা-এটাই এখন দুই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
কারাগারে অসুস্থ ইমরান খান
কারাগারে অসুস্থ ইমরান খান
নাইজেরিয়ায় যাত্রীবাহী বিমানের ইঞ্জিনে মাঝ আকাশে বিস্ফোরণ
নাইজেরিয়ায় যাত্রীবাহী বিমানের ইঞ্জিনে মাঝ আকাশে বিস্ফোরণ
ইরানে শাসক পরিবর্তনই সেরা সমাধান, বললেন ট্রাম্প
ইরানে শাসক পরিবর্তনই সেরা সমাধান, বললেন ট্রাম্প