রামেক হাসপাতালের মৃতদেহ নিয়ে মাইক্রোবাস চালকদের বাণিজ্য

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মৃত রোগীদের নিয়ে চরম বাণিজ্যে নেমেছে মাইক্রোবাস চালকরা। বছরের পর বছর ধরে এই চালকরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মৃত্যুর পরে এক প্রকার জিম্মি করে দুই থেকে চার গুন হারে টাকা আদায় করে আসছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। অনেক সময় অর্থাভাবে রোগীর স্বজনরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যেতে ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়ছেন। এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরী হয়েছে রোগীর স্বজনদের মাঝে। কিন্তু রাজশাহীর এই মাইক্রোবাস সিন্ডিকেটকে কেউ রুখতে পারছেন না। ফলে দিনের পর দিন তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে, চলতি বছরে গতকাল দুপুর একটা পর্যন্ত এ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বা চিকিৎসা নিতে মারা গেছে এক হাজার ৮৩ জন রোগী। এসব মৃত রোগীর মধ্যে সাধারণ রোগ-বালাইয়ে মারা গেছে ১ হাজার দুই জন। আর সড়ক দুর্ঘটনা, মারামারি বা আত্মহত্যাজনিত কারণে মারা গেছে আরও ৮১ জন। এই মৃতদেহগুলো হাসপাতালের ৬ নম্বর ইন্টার্ন গেট দিয়ে বের করা হয়। আর সেখানেই ওঁৎ পেতে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা মাইক্রোবাস (কোনো কোনোটি অ্যাম্বুলেন্স নাম দিয়ে চালানো হয়)। হাসপাতালের ওই গেট দিয়ে মৃতদেহ বের করার আগেই সব্জনদের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করেন মাইক্রো চালকরা।
সামনে যে মাইক্রো দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটিতেই নিয়ে যেতে হয় মৃতদেহগুলো। ফলে ওই মাইক্রোবাসের চালক মৃত রোগীর স্বজনদের নিকট যে টাকা চাইবেন, সেই টাকাতেই নিয়ে যেতে হবে বাড়িতে। এর বাইরে কোনো গাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে না মৃতদেহ। সেটি করলেও ওই চালককে টাকা দিয়ে যেতে হবে। না হলে তারা ঝামেলা করেন মৃত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে মৃতদেহ জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে মাইক্রোবাস চালকরা।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার ফারুক হোসেন নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘সম্প্রতি তাঁর এক আত্মীয় মারা যান রামেক হাসপাতালে। রাজশাহী শহর থেকে তানোরের দূরুত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার। এই ৩০ কিলোমাটর পথ মৃতদেহ পরিবহণ করতে হাসপাতালকেন্দ্রীক গড়ে উঠা মাইক্রোবাস সিন্ডিকেট দিতে হয় সাত হাজার টাকা। অথচ ওই মাণের একটি মাইক্রোবাসের ভাড়া হবে সর্বোচ্চ ১৫শ টাকা।’
গতকাল সকাল ১১টার দিকে এ হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে মারা যান আনসার আলী নামের এক রোগী। তাঁর বাড়ি দুর্গাপুরে। রাজশাহী শহর থেকে আনসার আলীর বাড়ির দূরুত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এই পথ যেতেই তাঁর নিকট থেকে ভাড়া আদায় করা হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকা না দিতে চাইলে লাশ নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন মাইক্রোবাস চালকরা। ফলে বাধ্য হয়ে সেই টাকা দিয়েই মরদেহ নিয়ে যান স্বজনরা।
মহিদুল ইসলাম নামের এক রোগী মারা যান গতকাল সকালে। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলা সদর এলাকায়। তাঁর স্বজন আকছেদ আলী জানান, তাঁদের নিকট থেকে ১২ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। অথচ তারা যখন চুয়াডাঙ্গা থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া করে রাজশাহী হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন ওই এলাকার গাড়ি ভাড়া দিতে হয়েছিল ৫ হাজার টাকা। সেই হিসেবে ৭ হাজার টাকা বেশি দিতে হয়েছে তাঁদের।
বিষপান করে দিলরুবা খানম নামের এক নারী গতকাল রামেক হাসপাতালে মারা যান। তাঁর বাড়ি নওগাঁ সদর এলাকায়। তাঁর মরদেহ নিয়ে যেতে রাজশাহীর এ মাইক্রোবাস সিন্ডিকেট পরিবারের নিকট থেকে আদায় করেন ১০ হাজার টাকা। এইভাবে মৃতদেহ জিম্মি করে দুই-চার গুন হারে বেশি টাকা আদায় করছে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে তাঁর এক আত্মীয় মারা যান রামেক হাসপাতালে। সেই আত্মীয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতেও তাঁকে অতিরিক্ত প্রায় ৮ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে। না হলে অন্য কোনো গাড়িতে মরদেহ তুলতে দেয়নি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।’
হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রামেক হাসপাতাল কেন্দ্রীক এই মাইক্রোবাস সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় জনি ও সাদ্দাম হোসেনসহ অন্তত ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হাসপাতালকেন্দ্রীক অন্তত দেড়শ লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা মাইক্রোবাস। যেগুলোর অধিকাংশই এ্যাম্বুলেন্স নাম দেওয়া হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের দেয়া সিরিয়াল অনুযায়ী একের পর এক মাইক্রোবাস মৃতদেহ পরিবহণ করে। ফলে সিরিয়ালে যেটি পড়ে, সেটিতেই নিয়ে যেতে হয় মৃতদেহগুলো। আর তাতেই মৃতদেহ জিম্মি করে বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে এ হাসপাতালে।
তবে সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট নাই। যে যার মতো ভাড়া আদায় করে। ভাড়া নির্ধারিত নাই। আমরা মাইক্রোবাস ভাড়ার ব্যবসা করি শুধু। মৃতদেহ জিম্মি করার কোনো সুযোগ নাই।’
রামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) আবু তালেব বলেন, ‘এই অভিযোগটা অনেক দিনের। কিন্তু এখানে আমাদের তেমন কিছু করার নাই। কারণ মাইক্রোবাসগুলোর হাসপাতালের বাইরের। তার পরেও আমরা কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এর আগে। কিন্তু সেটিও আর কাজে আসেনি। তার পরেও এগুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা করবো পরিচালক সাহেবের সঙ্গে।’
ভিওডি বাংলা/ মোঃ রমজান আলী/ আ







