প্রসূতিকে জরুরী সেবা না দিয়ে ক্লিনিকে রেফার

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা এক প্রসূতি মাকে সেবা না দিয়ে পাশের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এতে নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের এক প্রসূতিকে ঘিরে এ ঘটনা ঘটে।
রোগীর স্বজনদের ভাষ্যমতে, প্রসবজনিত ব্যথা শুরু হলে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে শংকরকাটি এলাকায় পৌঁছে ইজিবাইকেই সন্তান প্রসব করেন এক প্রসূতি মা। তবে শিশুর জন্ম হলেও প্রসূতির ফুল (প্লাসেন্টা) না পড়ায় দ্রুত তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, ওই সময় জরুরি বিভাগে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। এ সময় নিজেকে জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচয় দিয়ে সেলিম হোসেন নামের এক যুবক সেখানে চিকিৎসক নেই উল্লেখ করে রোগীকে পার্শ্ববর্তী আনিকা প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে রোগীকে দ্রুত আনিকা প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেলে সেখানে ডা. আনিসুর রহমানসহ ক্লিনিকের দায়িত্বরত সদস্যরা তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর ক্লিনিকের কয়েকজন নার্স একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন। এ সময় চিকিৎসা বাবদ খরচ জানতে চাইলে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে বলে জানানো হয়।এতে স্বজনরা অপারগতা প্রকাশ করলে কমিয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
রোগীর পরিবার জানায়, এতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় তারা রোগীকে ক্লিনিক থেকে নিয়ে যেতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে রোগীর স্বামী কামাল উদ্দিন (৩৬) ও তার বড় ভাবি জাকিয়া সুলতানা (৩৮) গুরুতর আহত হন। এছাড়া ফাতিমা খাতুন ও শাহানারা খাতুনকেও মারধর করা হয়। আহতরা বর্তমানে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত জাকিয়া সুলতানা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাব ভেবেই রোগীকে সেখানে নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করা হয় এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় চিকিৎসা তো পাইনি, উল্টো মারধরের শিকার হয়েছি। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকার কথা ছিল ডা. নাজমুল হুদার। হাসপাতালের রেকর্ডে তার দায়িত্ব থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, নিজেদের মধ্যে দায়িত্বের আন্তঃপরিবর্তনের মাধ্যমে ওই সময়ের দায়িত্ব ডা. আনিসুর রহমানকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে হাসপাতালের একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ে ডা. আনিসুর রহমান জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন না করে তার পরিচালিত আনিকা ক্লিনিকে অবস্থান করছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ ছিল ফাকা।
এদিকে, রোগীর বড় দেবর আলাউদ্দিন সানা শ্যামনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চিকিৎসা বাবদ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয় এবং ডেলিভারি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্লিনিকের ভেতরে আটকে রেখে মারধর করা হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, রোগীর স্বজনরাই তার ওপরে হামলা করেছে।
অপর দিকে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ডা. নাজমুল হুদার পরিবর্তে তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি অস্বীকার করে ডা. আনিসুর রহমান বলেন, হাসপাতালের রেকর্ড দেখেন, আমি সে সময় দায়িত্বে ছিলাম না।
অভিযোগের বিষয়ে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি হাসপাতালে আসা জরুরি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ নতুন নয়। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. তরিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন জানিয়ে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
ভিওডি বাংলা/ আবদুল্লাহ আল মামুন/ আ







