• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

অপরাজিত নেতা ফিরবেন সুস্থ হয়ে

   ৭ জানুয়ারী ২০২৫, ০২:১১ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র বেগম খালেদা জিয়া। তিন দশকের বেশি সময় ধরে আছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে। তিনবার দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। দুইবার ছিলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তবে রাজনীতির এই যাত্রাপথ মসৃণ ছিলো না। পেরোতে হয়েছে অনেক চড়াই-উৎরাই। বাংলাদেশের রাজনীতে তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি কখনো।

১৯৮১ সালের ৩০মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে রাষ্ট্র ও রাজনীতির এক টালমাটাল অবস্থায় দলের হাল ধরেন গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া। এরপরের লড়াই নিজেকে প্রতিষ্ঠার। লড়াই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দিশেহারা হয়ে পড়া দলকে গুছিয়ে তোলার। 

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে মাঠে থেকে বেগম জিয়া হয়ে উঠেছেন পোড় খাওয়া এক তুখোড় রাজনীতিবিদ। এরশাদ বিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অনেকে পর্দার আড়ালে আঁতাত করেছেন তার সঙ্গে। অংশ নিয়েছেন স্বৈরশাসকের অধীন  নির্বাচনে। কিন্তু বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বরাবরই থেকেছেন আপোষহীন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর লড়াইয়ে তিনি উপাধী পেয়েছেন আপোষহীন নেত্রী বলে।
নব্বইয়ে এরশাদ পতনের বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদের অস্থায়ী সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বেগম জিয়া। এরপর ’৯৬;র ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আবারও প্রধানমন্ত্রী হোন তিনি। যদিও অনেকেই এটিকে একতরফা নির্বাচন বলে মন্তব্য করেন। এই সংসদের মেয়াদ ছিলো ১১ দিন। এই সংসদেই পাস হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন।

একই বছরের ১২ই জুন বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। এই মেয়াদের শেষের দিকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবেন এনিয়ে শুরু হয় চরম বিতর্ক। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরু করেন লাগাতার আন্দোলন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের কাছে। তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক দলগুলোর লাগাতার আন্দোলন সংগ্রামের কারণে দেশে তৈরি হয় এক ধরণের অরাজক পরিবেশ। ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন।  ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দায়িত্বে আসেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমেদ। একে বলা হয় ওয়ান ইলেভেন বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। গ্রেফতার হন বেগম জিয়া। অন্তরীণ থাকেন জাতীয় সংসদের পাশের একটি ভবনে। এ সময়ে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ থাকলেও — গ্রহণ করেননি বেগম জিয়া। এ সময় তার বিরুদ্ধে বেশকটি মামলা হয়। যার মধ্যে অন্যতম জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বসেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। ততোদিনে বিচারপতি এবিএম খায়রুর হকের রায়ের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে বাতিল হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বেগম জিয়া থেকে আন্দোলনের মাঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরানোর দাবিতে করতে থাকেন নানা কর্মসূচি। হরতাল অবরোধের পাশাপাশি চলতে থাকে সভা সমাবেশ। নির্বাচনের আগে বালুর ট্রাক দিয়ে গুলশান কার্যালয়ে প্রায় সকল শীর্ষ নেতৃত্বসহ অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বিএনপি চেয়ারপার্সনকে। ১৯৯১’র পর প্রথমবারের মতো সংসদের বাইরে থাকেন বেগম জিয়া।

২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দেয়া হয় বেগম জিয়াকে। নাজিমউদ্দন রোডের পুরানত জেলখানায় শুরু হয় বেগম জিয়ার বন্দি জীবন। নির্জন কারাগারে তার একমাত্র সঙ্গী থাকেন গৃহসহায়তাকারী ফাতেমা বেগম। 

জেলে থাকাকালীন অসুস্থ্য হয়ে পড়েন বেগম জিয়া। এরই মাঝে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও দণ্ডিত হন তিনি। ২০২০ সালে দেশে দেখা দেয় করোনা মহামারি। ওই বছরের ২৫ মার্চ তৎকালীন সরকার প্রধানের নির্বাহী আদেশে কারাগার থেকে মুক্তি পান বেগম জিয়া। শর্ত থাকে রাজনীতি করতে পারবেন না, বিদেশ যেতে পারবেন না। কিন্তু তার বিদেশ চিকিৎসার জন্য পরিবার থেকে বারবার আবদেন করা হয় সরকারের কাছে। চাওয়া হয় আদালতের অনুমতি। আদালতের নির্দেশে গঠিত হয় মেডিকেল বোর্ড। তবে দফায় দফায় চেষ্টার পরেও পাওয়া যায়নি বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি। এদিকে বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি হতে থাকে। দফায় দফায় চিকিৎসা নেন ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। কয়েক দফায় দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয় তাকে।

অবশেষে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। আসে অন্তবর্তীকালীন সরকার। ২৭ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে বাতিল হয় বেগম জিয়ার সব সাজা। মুক্ত মানুষ হিসেবে বের হয়ে আসেন তিনি। এরপর থেকেই চলছিলো তার বিদেশে চিকিৎসার তোড়জোর। অবশেষে ৭ জানুয়ারি কাতার আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলেন তিনি।

লেখকঃ গণমাধ্যমকর্মী।


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়