মেলার মানুষ
মেলা মাঠের ভিড় শেষে…

খান মুহাম্মদ রুমেল
এবারের বইমেলার শেষের দিনের সন্ধ্যা। রমনা কালিমন্দিরের পাশে ঝুপড়ি দোকানে চায়ের কাপ হাতে আড্ডায় মেতেছেন অনেক মানুষ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোট ছোট জটলা। সব আড্ডার বিষয় বই এবং বইমেলা নিয়ে। ওদিকে মন্দিরের পাশের ছোট্ট পুকুরে এখনও ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। পুকুরের উপরে বসন্তের আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। শাওয়ালের চাঁদ দেখার আশায় কেউ কেউ তাকাচ্ছেন আকাশের দিকে। পদ্মপুকুরের জলে মেলা মাঠের বিজলি বাতির ঝলক। মেলা মাঠের নিয়ন আলো মিলেমিশে প্রকৃতি জুড়ে তৈরি করেছে মায়াময় পরিবেশ। মনে মনে ভাবি এই সন্ধ্যাটা পেরিয়ে পরের সন্ধ্যায় অনেকটাই শুনশান হয়ে যাবে এই এলাকা। এই তারা ভরা আকাশ, এই পুকুর, এই নিয়ন আলো মাখা সন্ধ্যা, এই বিশাল মেলার মাঠ — সব পড়ে থাকবে নিথর নিস্তব্ধ। মনটা মনটা কেমন হুহু করে ওঠে।
এক জায়গায় চায়ের কাপ হাতে আড্ডায় দেখি কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে। যারা মাসজুড়ে বইমেলার খবর সংগ্রহ করেছেন। এক অনুজ সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করি— মেলাতো শেষ হচ্ছে আজ। কেমন লাগছে? তার ছোট্ট উত্তর— খুব খারাপ লাগছে। আরেকজনকে জিজ্ঞেস করি একই প্রশ্ন। তিনি বলেন, ভালো লাগছে। যা ধুলা ছিল। অসহ্যকর অবস্থা! এবার আগের জন বলেন, ধুলা ছিল অনেক। তবুও খুব ভালো লেগেছে এই একটা মাস। পাশে দাঁড়ানো এক জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ধুর কিসের এক মাস ধরে মেলা হয়! মেলা হওয়া উচিত তিন মাস!
সন্ধ্যার একটু আগে বাংলা একাডেমি ঘোষণা মঞ্চ থেকে মাইকে বলা হচ্ছিলো- একটু পরেই শুরু হবে সমাপনী অনুষ্ঠান। ঘোষণা শুনে এক কবি বলেন, সমাপনী শব্দটা শুনলেই বুকের কোথায় যেন ব্যথা লাগে!
বইমেলায় একটা চিত্র বরাবর আমার বেশ ভালো লাগে। বাবা-মায়ের হাত ধরে আসে ছোট ছোট শিশুরা। এবারও ছিল এমন মনোহর দৃশ্য। তবে এরমাঝে একটা দৃশ্য দেখে কষ্ট লেগেছে খুব। কোনো কোনো শিশু পছন্দ করেছে প্রিয় বই। বইটি বুকের কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। কিন্তু বইয়ের দাম দেখে বাবার মুখ কালো হয়ে গেছে। পঁচিশ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি হয় জেনেও আরও কিছুটা দাম কমানোর জন্য বিক্রিকর্মীর সঙ্গে দরাদরি করছেন। ওদিকে শিশুটির মনে সংশয়, বইটি শেষ পর্যন্ত পাব তো? সাধের সঙ্গে সাধ্যের সমন্বয়ের এই প্রাণান্ত চেষ্টা দেখে বুক ভেঙে যায় আমার। আহারে বাবা! আহারে সেই দেবশিশু! সাধ্য থাকলে মেলার সব কিনে ছেলেটির হাতে তুলে দিতাম আমি!
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এবারের মেলা নানা কারণেই আলোচিত ছিলো। বই প্রকাশ কেন্দ্র করে স্টল বন্ধ করে দেয়া, প্রকাশককে পুলিশি হেফাজতে নেয়া, কবিতা লেখার দায়ে কবি সোহেল আহসান গালিবকে গ্রেফতার করা, মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ নিয়ে ঝামেলা, উদ্বোধনী দিনেই ডাস্টবিন কাণ্ড— সব মিলিয়ে নানা আলোচনা ছিলো এবারের মেলায়। সবচেয়ে বড় কথা— এবার বই বিক্রি নিয়ে মাসজুড়ে হাহাকার করে গেছেন লেখক প্রকাশকরা। খুবই মন্দা ছিলো বেচাকনা। তবে বিশেষ বিশেষ দিনে উপচে পড়া ভিড় ছিলো। সেই ভিড়ে পাঠক ক্রেতা ছিলেন না। ছিলেন কেবল অতি উৎসাহী আগন্তুক, প্রগলভ সেলফি শিকারি ইত্যাদি নানা কিসিমের মানুষ।
গেলো বছরের তুলনায় এবার বই প্রকাশ হয়েছে কিছুটা কম। বাংলা একাডেমির তথ্য মতে এবার বই প্রকাশ হয়েছে ৩ হাজার ২৯৯টি। গত বছর এই সংখ্যাটা ছিলো ৩ হাজার ৭৫১। তবে এবার মোট কত টাকার বই বিক্রি হয়েছে সেই হিসাব বাংলা একাডেমি দিতে পারেনি শেষ দিনে। তবে নিজেরা ৬১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৩ টাকার বই বিক্রি করেছে বলে জানিয়েছে! এই তথ্য শুনে একজন প্রশ্ন তুলেছেন এবার বিক্রির অবস্থা ভীষণ খারাপ বলেই কি বাংলা একাডেমি মোট বেচাকেনার তথ্যটা দিলো না? কে জানে আসলে কোন কারণে দেয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম, একজন প্রশ্ন তুলেছেন- মানুষের বইপড়ার আগ্রহ কমে গেছে? নাকি পণ্যমূল্যের লাগামহীন গতির কারণে এই অবস্থা? যৌক্তিক প্রশ্ন। প্রশ্নের মধ্যে চিন্তার খোরাক আছে!
মেলায় প্রতিদিন প্রকাশ হয়েছে অনেক বই। কিছুক্ষণ পরপর বাংলা একাডেমির ঘোষণা মঞ্চ থেকে জানান দেয়া হয়েছে, নব প্রকাশিত বইয়ের তথ্য। প্রতি বছরই ঘুরে ফিরে একটা প্রশ্ন আসে- এতো এতো বইয়ের মধ্যে ভালো বই কয়টা। প্রশ্ন আরও আছে- বইমেলায় পাঠকের চেয়ে লেখক কি বেশি? প্রশ্নগুলো যে একেবারে অবান্তর তা কিন্তু নয়। মেলা এলেই প্রতিবছর দেখা যায়— সমাজের নানা স্তরে বিভিন্নভাবে এগিয়ে থাকা এবং প্রভাব রাখা ব্যক্তি এবং তাদের স্বজনদের বই প্রকাশের হিড়িক লাগে। ঘটা করে প্রকাশনা উৎসব হয় এসব বইয়ের। তারপর তার চেয়েও ঘটা করে চলে সেলফি উৎসব। লেখক নিজেই দুই তিনশ কপি বই কিনে নেন। প্রকাশকের লগ্নি উঠে যায় তাতে। আর সেই সব অতি প্রভাবশালী এবং পাতি প্রভাবশালীরা নিজের নামের সঙ্গে লেখক তকমা লাগিয়ে স্টলের মধ্যে হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকেন। পরিচিত মানুষজনকে ধরে এনে হাসিমুখে অটোগ্রাফ বিলান।
আর এদিকে অনামা যে তরুণ নিজের মেধার সবটুকু খাটিয়ে একটা ভালো বই লিখেছেন— তিনি থেকে যান প্রচারের আলোর বাইরে। প্রচার প্রসঙ্গ যেহেতু এলো- এ নিয়ে আরও কয়টা কথা বলা যেতে পারে। ইদানিং বইয়ের প্রচারের দায়িত্ব পুরোটা চেপেছে লেখকের কাঁধে। প্রকাশক এখানে দায়হীন। শুধু কিছু তারকা লেখকের বই নিয়ে প্রকাশকের মাতামাতি থাকে। আর কাউকে নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই।
বলছিলাম প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লেখক হয়ে ওঠার বাসনার কথা। এ ছাড়াও আরেক শ্রেণির লেখক আছে। যাদের বলা চলে স্তাবক লেখক। নিজে কী লিখলেন না লিখলেন তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আগ্রহও নেই। ওইসব প্রভাবশালী মৌসুমি লেখকের চাটুকারিতা করেই কাটে তাদের দিন। আরেক শ্রেণির লেখক আছেন- যারা কোনোমতে একটি বই প্রকাশ করতে পারলে, হন্যে হয়ে টিভি ক্যামেরার পেছনে ঘোরেন। তাদের ভাবনা হচ্ছে কোনোমতে একটা টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে পারলেই জীবনে মোক্ষ অর্জন হয়ে যাবে।
অনেকেই বলেন, নতুন লেখক উঠে আসছে না। এখানেও কিছু কথা আছে। বইমেলায় এবার অংশ নিয়েছে সাতশ’র বেশি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে কোন প্রকাশনী থেকে কি বই বের হয়েছে, পাদ প্রদীপের আলোয় না থাকা একজন লেখক কী লিখেছেন— তা জানা বা খুঁজে বের করা একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে কতটা সম্ভব? ওইদিন মেলার মাঠের আড্ডায় একজন বলছিলেন— বইয়ের প্রচার টচার তেমন না থাকায় মানুষজন আসে না। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরেন। কিন্তু অনামা লেখকের ভালো বই খুঁজে বের করতে না পেরে শেষে পরিচিত লেখকদের বই কিনে বাড়ি ফিরে যান। আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন— নতুন লেখক উঠে আসছে না। কথাটা কতটুকু সত্যি জানি না। তবে বিষয়টি একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার মতো না।
একটা কথা বলি। বাংলা একাডেমি প্রতি বছর মেলা আয়োজন করে বটে। তবে মেলাকে এখনও পাঠকবান্ধব করতে পারেনি। প্রতি বছর স্টল বরাদ্দ দেয়া হয় লটারির মাধ্যমে। এটা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। যেসব প্রকাশক ভালো বই প্রকাশ করেন কিংবা যাদের বই ভালো চলে তাদের অবশ্যই ভালো জায়গায় স্থান দেয়া উচিত। লটারি নামক ভাগ্য নির্ধারণী খেলায় তাদের ঠেলে দেয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। এ ছাড়া এতো বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মেলা করা উচিত কি না তাও ভেবে দেখার কথা বলছি।
গেল কয়েক বছর ধরেই একটা কথা খুব উঠছে মেলার মাঠে। মেলায় কোনো চায়ের দোকান নেই। আছে নির্দিষ্ট একটি কফির দোকান। তাদের কয়েকটি আউটলেটে বিস্বাদ কফি বিক্রি হয়। মেলায় আসা লেখক পাঠক সব মানুষই বাধ্য হচ্ছেন এই কফি খেতে। গত কয়েক বছর ধরেই এই অবস্থা! কেন? বাংলা একাডেমি কোন স্বার্থে এই কাজটি করে যাচ্ছে? মেলায় খাবার দোকান নিয়েও আছে অনেক কথা। খাবারের দোকানগুলোর জন্য বিশাল এলাকা বরাদ্দ করেছে বাংলা একাডেমি। তারা গলাকাটা দামে বিক্রি করছে খাবার। একটি পিঠার দাম নাকি তারা রাখছে ৫০ টাকা। অথচ মেলা চত্বরের ঠিক পাশেই টিএসসি এলাকায় একই পিঠা বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে দশ টাকায়! খাবারের চড়া দাম থেকে এক দর্শনার্থীর প্রশ্ন এটা কি বাণিজ্য মেলা? এছাড়া এবার তো টিএসসি গেট দিয়ে ঢোকার পর, বারোয়রি পণ্যের দোকান দেখে এটাকে আদতে বাণিজ্য মেলাই মনে হয়েছে।
শুরু করেছিলাম মেলা মাঠের আড্ডার দিয়ে। এমন আড্ডা মাসুজুড়ে হয়েছে, বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোনায় কোনায়। কত স্বপ্নের জাল বুনেছেন কত তরুণ কবি লেখক। কত পাঠক প্রিয় লেখকের বই কিনে মেলার মাঠের কোনো এক জায়গায় বসে পড়েছেন। হাজার কোলাহলের মাঝেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত নির্জনতা প্রিয় বইয়ের পাতায়। কেউবা বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে ফেরত গেছেন বাড়িতে। বাউণ্ডুলে নগরে প্রেম ভালোবাসার খোঁজ পেয়েছেন অনেকেই এই বইমেলায় এসে। কারো পকেটে টান পড়েছে বলে প্রিয় বইটি কিনতে না পেরে অনেকেই চলে গেছেন বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। সবার জন্য শুভ কামনা। আসছে বছর আবার দেখা হবে- এই মেলায়। প্রান্তর ভেসে যাওয়া ভালোবাসায়।
ভিওডি বাংলা/এম







