কেন ভারতে ‘অনশন’ এত শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা?

ভারতে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাসে অনশন বা অনির্দিষ্টকালের উপবাস এমন এক কৌশল, যা শুধু সরকারকে চাপে ফেলেনি, বরং দেশের মানচিত্রও বদলে দিয়েছে। সাত দশকেরও বেশি সময় আগে এক ব্যক্তির অনশন নতুন একটি রাজ্যের জন্ম দিয়েছিল। সেই ইতিহাস আজ আবার আলোচনায় এসেছে, কারণ পরিবেশবাদী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন দেশজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যে অনশন বদলে দিয়েছিল ভারতের মানচিত্র
১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে পট্টি শ্রীরামুলু নামে এক গান্ধীবাদী কর্মী পৃথক তেলুগুভাষী রাজ্যের দাবিতে অনশন শুরু করেন। সে সময় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এই দাবি মানতে অনাগ্রহী ছিলেন। শ্রীরামুলু বিশ্বাস করতেন, অহিংস আত্মত্যাগই দিল্লিকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারে।
টানা ৫৮ দিন অনশন করার পর তার মৃত্যু হয়। এরপর তেলুগুভাষী অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ভবনে হামলা, রেলপথ অবরোধ এবং সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতির চাপে কয়েক দিনের মধ্যেই নেহরু পৃথক অন্ধ্র রাজ্য গঠনের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে গঠিত হয় স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন কমিশন, যার মাধ্যমে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসে।
ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, "পট্টি শ্রীরামুলু আজ অনেকটাই বিস্মৃত। অথচ তিনি ভারতের ইতিহাস ও ভূগোল—উভয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।"
নতুন আলোচনায় সোনম ওয়াংচুক
বর্তমানে আবারও অনশনকে কেন্দ্র করে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। লাদাখের শিক্ষাবিদ, উদ্ভাবক ও জলবায়ু আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অনলাইনে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’-এর শিক্ষা সংস্কার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই কর্মসূচি শুরু করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ১৯ দিন ধরে শুধুমাত্র লবণ মেশানো পানি পান করে বেঁচে আছেন এবং ইতোমধ্যে তার ওজন ৯ কেজিরও বেশি কমে গেছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। দিল্লি হাইকোর্ট সরকারকে তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
কেন ভারতে অনশন এত শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা?
বিশ্বের বহু দেশেই অনশন রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি মাধ্যম। তবে ভারতের ক্ষেত্রে এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি অনেক গভীর।
হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম—তিন ধর্মেই আত্মসংযম ও উপবাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই ঐতিহ্যকে আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিবাদের রূপ দেন মহাত্মা গান্ধী।
১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে গান্ধী অন্তত ১৫টি বড় অনশন করেছিলেন। কখনও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে, কখনও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে, আবার কখনও রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে। তার সবচেয়ে দীর্ঘ অনশন ছিল ২১ দিনের। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে জীবনের শেষ অনশন মাত্র পাঁচ দিন স্থায়ী হলেও তা দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গান্ধীর ভাষায়, "অনশন হলো তলোয়ারের পরিবর্তে আমার শেষ আশ্রয়।"
স্বাধীন ভারতের আন্দোলনে অনশনের ধারাবাহিকতা
স্বাধীনতার পরও ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে অনশন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে রয়ে গেছে।
কৃষকদের অধিকার, সংরক্ষণ নীতি, পরিবেশ রক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা বিতর্কিত আইন বাতিলের দাবিতে অসংখ্য অনশন হয়েছে।
২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের ১৩ দিনের অনশন সারা দেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
অন্যদিকে মণিপুরের কর্মী ইরম শর্মিলা সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (এএফএসপিএ) বাতিলের দাবিতে টানা ১৬ বছর অনশন চালান। সরকার তাকে নল দিয়ে জোরপূর্বক তরল খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে।
এছাড়া বড় বাঁধ নির্মাণে বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে সমাজকর্মী মেধা পাটকরও একাধিকবার দীর্ঘ অনশন করেছেন।
অনশন কেন কার্যকর হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের নৃবিজ্ঞানী সায়ন্তন সাহা রায়ের মতে, অনশন শুধু সরকারের উদ্দেশে নয়, জনগণের কাছেও একটি শক্তিশালী বার্তা।
তার ভাষায়, অনশনকারীর শরীর যত দুর্বল হয়, সরকারের ওপর নৈতিক চাপ তত বাড়ে। কিন্তু এই কৌশল তখনই কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ সেই আত্মত্যাগকে গুরুত্ব দেয় এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি আয়ারল্যান্ডের অনশন আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বলেন, অনশনকারীরা নিজেদের কষ্টকে রাষ্ট্রের কঠোরতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তবে জনগণ সাড়া না দিলে অনশন ব্যর্থও হতে পারে।
সমালোচনাও কম নয়
সবাই অবশ্য অনশনকে ইতিবাচকভাবে দেখেন না।
ভারতের সংবিধানের প্রধান রূপকার ড. ভীমরাও আম্বেদকর স্বাধীনতার পর স্পষ্টভাবে মত দেন যে, সাংবিধানিক পদ্ধতি চালু হওয়ার পর অনশন ও অসহযোগ আন্দোলনের মতো কৌশল পরিত্যাগ করা উচিত। তার মতে, এসব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে এবং "অরাজকতার ব্যাকরণে" পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
২০১১ সালে আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দার্শনিক প্রতাপ ভানু মেহতা লিখেছিলেন, মৃত্যু পর্যন্ত অনশন কখনও কখনও "নৈতিক চাপ প্রয়োগের নামে এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলে" পরিণত হতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেক রাজনৈতিক অনশন নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, কিছু অনশন কেবল প্রচারণার জন্য মঞ্চস্থ হয় এবং বাস্তবে কঠোরভাবে পালন করা হয় না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বড় ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, টানা দুই সপ্তাহ না খেলে শরীর শুধু চর্বিই নয়, পেশিও ভাঙতে শুরু করে। শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রাণঘাতী হৃদ্রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার দীর্ঘ অনশনের পর হঠাৎ স্বাভাবিক খাবার শুরু করলেও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ কারণেই অনেক ক্ষেত্রে সরকার অনশনকারীদের হাসপাতালে নিয়ে জোরপূর্বক তরল খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে।
ওয়াংচুকের অনশন কি ইতিহাস গড়বে?
সোনম ওয়াংচুকের অনশন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও নাগরিক সমাজের অনেকেই তাকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তিনি গান্ধীর পথই অনুসরণ করছেন। তার শারীরিক অবস্থা যত অবনতির দিকে যাচ্ছে, ততই সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ বাড়ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই অনশন কি পট্টি শ্রীরামুলুর মতো ইতিহাস সৃষ্টি করবে, নাকি ইরম শর্মিলার মতো দীর্ঘ আত্মত্যাগের প্রতীক হয়েও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে না—সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—ভারতে অনশন শুধু প্রতিবাদের কৌশল নয়; এটি এখনো নৈতিক আবেদন, রাজনৈতিক প্রতীক এবং গণতান্ত্রিক চাপ সৃষ্টির এক অনন্য মাধ্যম, যার প্রভাব আজও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি।
সূত্র: বিবিসি
ভিওডি বাংলা/আরআর/আ








মন্তব্য