• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

এআই-এর প্রতিটি উত্তরের পেছনে যেভাবে কাজ করছেন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা

   ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৮ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে ডেটা অ্যানোটেটর বা এআই ট্রেইনারদের চাহিদা। এই খাতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি তৈরি করেছেন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররাও। তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পে যেমন আয়ের সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কম মজুরি, অটোমেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিয়ে নানা উদ্বেগ।

২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তারা দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন।

চ্যাটজিপিটি সাধারণ মানুষের কাছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) প্রযুক্তিকে পরিচিত করে তোলার প্রায় চার বছর পর এখন এআই ব্যবসায়িক বিভিন্ন জটিল কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ইমেইল লেখা, কোড তৈরি, ভিডিও নির্মাণসহ নানা ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে এআইয়ের প্রতিটি নির্ভুল উত্তরের পেছনে কাজ করেন বাস্তব মানুষ। ডেটা অ্যানোটেটর বা এআই ট্রেইনাররা মডেলের উত্তর যাচাই করেন, বিভিন্ন উত্তরের মান মূল্যায়ন করেন, ভুল সংশোধন করেন এবং সিস্টেমকে আরও নির্ভুল করে তোলেন। এই ক্রমবর্ধমান শিল্পে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও যুক্ত রয়েছেন।

ডেটা অ্যানোটেটরের কাজ কী?

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেটায় (ফেসবুকের মাতৃপ্রতিষ্ঠান) ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে কাজ করেছেন তাওসিফ নিলয়। নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমি মূলত নির্দিষ্ট কিছু প্রম্পট বা নির্দেশনার সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে ডেটা লেবেলিং করতাম। এআই মডেলগুলো যাতে কোনো ক্ষতিকর বা নীতিবিরুদ্ধ উত্তর না দেয়, সেজন্য বিভিন্নভাবে সেগুলোকে পরীক্ষা করা হতো। এর মধ্যে কোড ইনজেকশন কিংবা ভুল তথ্যের মাধ্যমে এআইকে বিভ্রান্ত করার মতো পদ্ধতিও ছিল।"

তাওসিফের দায়িত্বের মধ্যে ছিল মডেল টেস্টিং ও 'রেড-টিমিং'। এই প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে একটি এআই মডেলের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়।

এ ছাড়া এই পেশায় ছবি ও অডিও ট্যাগিং, চ্যাটবটের উত্তর মূল্যায়ন, উত্তর লিখে রাখা এবং সেগুলোর মান নির্ধারণের মতো কাজও নিয়মিত করতে হয়।

এই ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও সংশোধনের মাধ্যমে এআই শিখে কোন ধরনের উত্তর মানুষ বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করে এবং কোন তথ্য ক্ষতিকর বা অনুপযুক্ত। হাজার হাজার এমন সংশোধনের ফলেই আজকের এআই মানুষের মতো সাবলীল ভাষায় উত্তর দিতে সক্ষম হচ্ছে।

দ্রুত বাড়ছে বৈশ্বিক বাজার

ডেটা অ্যানোটেশন শিল্পের আকারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। 'স্ট্রেটস রিসার্চ'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেটা অ্যানোটেশন টুলের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটি থেকে ৪৩ কোটি মানুষ ছবি লেবেলিং, কনটেন্ট রিভিউসহ এআই প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনলাইন কাজে যুক্ত রয়েছেন।

তবে চাহিদা বাড়লেও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে অনেক সাধারণ ধরনের কাজ ধীরে ধীরে কমে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এই ফ্রিল্যান্সিং বাজার কতটা টিকে থাকতে পারবে।

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শক্তি হলো ইংরেজিতে দক্ষ বড় একটি জনশক্তি, যারা অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পন্ন করছেন। ২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারের প্রায় ১৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশের দখলে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন এবং তারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং কম্পিউটার ভিশন ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং বিশেষজ্ঞ নাবিল মোহাম্মদ বাংলাদেশের এআই প্রশিক্ষণ শিল্পকে বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তার মতে, "এআই ডেটার কাজ অনেকটা আগের বিপিও খাতের মতোই— যেখানে কম খরচে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো করা হয়। তবে এআই ডেটা নিয়ে কাজ করতে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। যদি আমরা এই অভিজ্ঞতাকে উচ্চমানের আউটপুট তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারি, তবে এটি স্রেফ আউটসোর্সিংয়ের আরেকটি জোয়ার হয়েই থেকে যাবে।"

তিনি আরও বলেন, "দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পারলে এই কাজগুলো এআই সাপ্লাই চেইনে প্রবেশের ভালো সুযোগ হতে পারে।"

কম মজুরি ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ

সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও। ২০২৫ সালে 'টাইম ম্যাগাজিন'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অ্যানোটেশনের জন্য আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে ঘণ্টাপ্রতি ১২.৫০ ডলার পর্যন্ত দিলেও কেনিয়ার কর্মীরা পান মাত্র ২ ডলার। একই ধরনের মজুরি বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরাও। লিংকডইনের চাকরির বিজ্ঞাপনেও প্রায়ই এমন কম পারিশ্রমিক দেখা যায়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেনিয়ার একটি আদালত রায় দেয়, দেশটির ১৮৪ জন আউটসোর্সড কনটেন্ট মডারেটরের জন্য মেটা আইনিভাবে দায়ী। এর জেরে প্রতিষ্ঠানটি ১.৬ বিলিয়ন ডলারের মামলার মুখে পড়ে। কম খরচে কাজ করানোর উদ্দেশ্যেই কোম্পানিগুলো সাধারণত নিম্ন মজুরির দেশগুলোকে বেছে নেয়।

ডেটা অ্যানোটেশন খাতে প্রবেশ তুলনামূলক সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে প্রয়োজন উন্নত দক্ষতা। সাধারণ লেবেলিং বা রেটিংয়ের কাজ সহজে শেখা গেলেও এসব কর্মী সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য হওয়ায় তাদের দরকষাকষির সুযোগ সীমিত থাকে, যা মজুরিও কমিয়ে রাখে।

অন্যদিকে রেড-টিমিং কিংবা পলিসি মেকিংয়ের মতো উচ্চ পর্যায়ের কাজে পারিশ্রমিক বেশি এবং এসব কাজ অটোমেশনের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এখনও পুনরাবৃত্তিমূলক সাধারণ কাজেই সীমাবদ্ধ।

এ বিষয়ে নাবিল মোহাম্মদ বলেন, "আমাদের অনেক মেধাবী তরুণ সাধারণ কাজে আটকে আছেন, যা তাদের ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতিতে কাজে আসছে না। সঠিক পরিবেশ পেলে তারা আরও উন্নত মানের কাজ করতে পারত। এআই প্রশিক্ষণ কাজে দিলেও আসল মূল্য আসে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। সব ট্রেনিং প্রোগ্রাম সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না, ফলে দক্ষতার একটি মিথ্যে ধারণা তৈরি হয়।"

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, "আজ যেসব দক্ষতার চাহিদা আছে, কয়েক মাস পরই তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য যদি আরও উঁচুতে না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।"

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

একজন ব্যক্তির জন্য ডেটা অ্যানোটেশনের কাজ দীর্ঘমেয়াদি পেশা নাকি সাময়িক আয়ের উৎস—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

ডেটা অ্যানোটেটর তাওসিফ নিলয়ের মতে, এই খাতে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষতা বাড়লে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর কিংবা নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট দলেও কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সাবেক এআই অ্যানোটেটর ফারদিন জারিফের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁর ভাষ্য, "প্রতিষ্ঠান পদোন্নতির আশ্বাস দিলেও এক বছরের মধ্যেই কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। ফলে ক্যারিয়ার উন্নয়নের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর হয়নি।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এই খাতে এখনও তুলনামূলক ভালো আয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা তৈরির সক্ষমতার ওপর।

নাবিল মোহাম্মদের ভাষায়, "এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত মানের মানবিক ইনপুটের প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই শুধু সেবা প্রদান নয়, নিজস্ব এআইভিত্তিক পণ্য ও সমাধান তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য কার্যকর নীতিমালা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।"

তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশকে শুধু এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এআই প্রযুক্তির সরবরাহকারী ও উদ্ভাবক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী এআই সমাধান তৈরিতে সরকার, বেসরকারি খাত ও গবেষকদের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।"

ভিওডি বাংলা/বিন্দু


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
এআই ছবি তৈরি ও এডিটের নতুন টুল আনলো মেটা
এআই ছবি তৈরি ও এডিটের নতুন টুল আনলো মেটা
রসায়নে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি
যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীন গেলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী
নির্বাচিত ক্যামন ও পোভা সিরিজের স্মার্টফোনে নতুন মূল্য ঘোষণা করেছে টেকনো। ছবি: সংগৃহীত
টেকনোর স্মার্টফোনে মূল্যছাড়