মেলার মানুষ
এইসব ভালোবাসাবাসি

খান মুহাম্মদ রুমেল
একটি দৈনিক পত্রিকার ২১শে ফেব্রুয়ারির বইমেলা নিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম— মেলাজুড়ে একুশের ছবি। এরপর পত্রিকাটি তাদের মূল প্রতিবদেন শুরু করে গতানুগতিক ধারায়— একুশের প্রথম প্রহরে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানো শুরু করার জল অনেক দিনের। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবদেন পর্বের পর একুশের ভোর থেকে শহীদ মিনারের বেদী ভরে ওঠে সর্ব সাধারণের ভালোবাসার ফুলে। আর বরাবরই এই মানুষদের একটা বড় অংশের পরবর্তী গন্তব্য হয় অদূরে চলমান অমর একুশে বইমেলা।….. শুক্রবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে মেলার ভিড় তুঙ্গে উঠে বিকেলের দিকে। যদিও পত্রিকাটি শিরোনাম করেছে— মেলাজুড়ে একুশের ছবি। তবের রিপোর্টের নিচে যে ছবিটি ছেপেছে— সটি কোনোভাবেই একুশের চেতনার সঙ্গে যায় না। অনেকটা বৈশাখী সাজের একটা রঙিণ ছবি ছেপেছে তারা!
এবার বিডি নিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কম–এর একটা রিপোর্টের কথা বলি। তারাও ছবিসহ প্রতিবেদন করেছে। তাদের রিপোর্টের শিরোনাম— একুশের সকালে ’জনশূন্য বইমেলা”। সঙ্গে তারা একটি ছবি দিয়েছে। ছবিতে দেখা যায় খাঁ খাঁ করছে মেলা প্রাঙ্গণ। পরে রিপোর্ট তারা বলছে— সকাল দশটা পর্যন্তু মেলায় তেমন মানুষই ছিলেন না। কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে তারা জানাচ্ছে— সকাল সাতটায় মেলা খোলার পর একটি প্রকাশনী দুটি বই বিক্রি করেছে। কোনো প্রকাশনী বিকি্রই করতে পারেনি।
তাহলে প্রথম যে পত্রিকার কথা বললাম, তারা অমন লিখলো কেন? আসলে ওই পত্রিকার রিপোর্টার সকালে মেলাতে যাননি। প্রথাগত ধারণার ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট লিখেছেন। যাই হোক। আমি দেখলাম সেটি নিয়ে বরং আলোচনা করা যাক।
একুশে ফেব্রয়ারি আমি মেলায় ঢুকি বিকেল সাড়ে চারটার দিকে। শাহবাগ মোড় পার হতেই টের পেতে থাকি মেলার উত্তাপ। দলে দলে মানুষ চলছেন মেলার দিকে। শাহবাগ থানা পেরিয়ে ফুটপাত কিংবা রাস্তা কোথাও ঠিক মতো হাঁটারও জো নেই। কেবল মানুষ আর মানুষ। সবাই হাঁটছেন। দুয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়িও আছে। তবে সেগুলো স্থবির হয়ে আছে রাস্তার মাঝখানে। মানুষের দলের সঙ্গে মিশে গিয়ে আমিও হাঁটতে থাকি। টিসএসসি’র উল্টোপাশে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ঢোকার মুখে গিয়ে একেবারে দিশেহারা অবস্থা। মানুষের ভিড়ের চোটে প্রাণ যায় যায়। একবার ভাবি চলে যাবো। পরে মনেহয় এতদূর পর্যন্ত যেহেতু এসেই পড়েছি— মেলা না দেখে যাবো না। গেটের ভিড় ঠেলে মেলায় ঢুকে যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। এতো ভিড়ের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি হলেও, ভালো লাগে। ভালো লাগে এই ভেবে— আজকে যারা এসেছেন এদের মধ্যে যদি অর্ধেকও পাঠক থাকেন, তাহলেও অনেক ভালো। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে একটু হাঁটতেই ভুল ভাঙতে থাকে। যত মানুষ এসেছেন তার ভাগও বই কিনছেন না। কেবল উদভ্রান্তের মতো হাঁটছেন, এখানে সেখানে ঢুঁ মারছেন। বইয়ের দোকানের সামনে অযথা ভিড় করছেন। যে সব প্রকাশনীতে তুলনামূলক ভিড় একটু কম— সেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বই হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন। তারপর বইটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য গন্তব্যে। কিছু স্টল প্যাভিলিয়ন বরাবরের মতো এবারও খুব নান্দিনিকভাবে বানানো হয়েছে। সেগুলোর সামনে দেখি ছবি শিকারিদের ভিড়।
এদের চোটপাটে বই কিনতে যারা এসেছেন, তাদের অনেককে দেখি স্টলের আশপাশেও ভিড়তে পারছেন না! হাঁটতে হাঁটতে কোথাও যাবো ভাবতে থাকি। কারণ মানুষের চাপে ঠিকমতো হাঁটার উপায় নেই। কোথাও যে একটু দাঁড়াবো সেই উপায়ও নেই। মেলার পুবিদকের পামগাছ ঘেরা খোলা জায়গাটার দিকে একটু ফাঁকা দেখে দাঁড়াই। এখানেও অনেক আড্ডাবাজের ভিড়। মিনিট পাঁচেক একা একা দাঁড়িয়ে থেকে আবার হাঁটতে থাকি। বিভিন্ন স্টল প্যাভিলিয়ন ঘুরে কয়েকটা বই কিনি। তারপর গিয়ে দাঁড়াই অনিন্দ্য প্রকাশের সামনে। অন্যান্য বছর প্রতিদিন অনিন্দ্য প্রকাশের ভেতরে বসতাম। অনেকে বই কিনে বইয়ে স্বাক্ষর নিতে চাইতো। ছবি তুলতে চাইতো। এবার একদিনও স্টলের ভেতরে বসিনি। তবে প্রায়ই এসে স্টলের সামনে দাঁড়িয়েছি। কেউ বই কিনলে স্টলের ছেলে মেয়েরা আমাকে দেখিয়ে দেয়। অনেকে এসে স্বাক্ষর নিয়ে যায়। আজকে সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে জোবায়ের ডাকে।
— ভাই ভেতরে এসে বসেন।
— না রে বসবো না। দাঁড়াই একটু।
কেউ কেউ বই কেনে। এসে স্বাক্ষর চায়। তাদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলি। এরমাঝে কোত্থেকে এসে হাজির হোন মনি ভাই।
— কি মিয়া বই বেচো?
— না ভাই, বেচতে আর পারলাম কই। মানুষ তো দেখি শুধু হাঁটে আর ছবি তোলে। বই কেনে না তো কেউ!
— তোমার মতো হ্যান্ডসাম লেখকের বই কেনে না। তাহলে আমার কি অবস্থা বোঝো!
— আপনি তো ভাই বড় লেখক।
— ধুর মিয়া শুধু ফাও পেচাল পারো! হাসতে থাকেন মনি ভাই।
চলে যান মনি ভাই। ঘুরে দেখি হাসিমুখে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টুটুল ও তার স্ত্রী। আগে যে বেসরকারি টেলিভিশনটাতে কাজ করতাম, সেখানে টুটুল আমার সহকর্মী ছিলো।
— ভাই কেমন আছেন?
— ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
টুটুল হাসে। হাসে তার স্ত্রীও। তিনজন মিলে টুকটাক কথা বলি। আড্ডা দেই। টুটুল একটি বই কেনে। ছবি তোলে আমার সঙ্গে। বউকে নিয়ে মিলে যায় মানুষের স্রোতে। একটু পর আসেন জহির ভাই। তিনিও টেলিভিশন চ্যানেলে আমার সহকর্মী ছিলেন। জহির ভাই দুইটা বই কেনেন। তারপর চলতে থাকে নানা কথা। কোত্থেকে এসে দুজন অনুজ গণমাধ্যমকর্মী সামনে দাঁড়ায়। সবাই মিলে কথা বলতে থাকি। আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় অনেক মানুষ। মানুষের ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ে পনের ষোলো বছর বয়সী এক মেয়ে ও তার বাবাকে। দুজনের হাতে অনেক বইয়ের প্যাকেট। এক বাবাকে দেখি সাত বছরের কন্যাকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছেন। মেয়েটা গরমে ভিড়ে অসুস্থ্য হয়ে গেছে। পেছন উদ্বিগ্ন মুখে হাঁটছে বারো তের বছরের একটা মেয়ে এবং তাদের মা।
— ভাই একটা ফ্যান পাওয়া যাবে কোথাও? আমার মেয়েটা অসুস্থ্য হয়ে গেছে। আমাদের দিকে কাতর গলায় বলেন বাবা।
— এখানে কোথাও মেডিকেল সেন্টার নেই? জানতে চায় কিশোরি মেয়েটা।
আমরা তাদের নিয়ে যাই মুক্তমঞ্চের দক্ষিণ দিকের বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্রে। ভেতরে একটা টেবিল আছে। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে ফ্যানের সামনে বসেন বাবা।
সন্ধ্যা সাতটার বেশি বাজে। আমার আর মেলায় থাকতে ইচ্ছে করে না। হাঁটতে থাকি গেটের দিকে। আমি আর জহির ভাই। আমার হাত থেকে বইয়ের প্যাকেটগুলো নিজের কাছে নিয়ে নেন জহির ভাই।
— ভাই ভিড়ের মধ্যে এতো বই হাতে হাঁটতে আপনার সমস্যা হবে। আপনি হাঁটেন। আমি পেছনে আছি।
— নাহ ভাই পারবো। সমস্যা নেই।
— আরে ভাই চলেন তো।
এরপর আর কথা বাড়াই না। ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া আর কি করার থাকে মানুষের! ভিড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে মেলা থেকে বের হয়ে এসে জহির ভাইকে বলি— আপনি মেট্রোধরে চলে যান। আমি দেখি শাহবাগ গিয়ে রিকশা টিকশা কিছু একটা পেয়ে যাবো।
— ভাই চলেন আমিএ আপনার সঙ্গে হাতিরপুল যাবো।
দুজন হেঁটে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত আসি। আজিজ সুপার মার্কেটের কোণা থেকে রিকশা নিয়ে হাতিরপুল এসে পরিচিত চায়ের দোকানটাতে বসি।
— জহির ভাই আপনি মেট্রোতে করে মিরপুর চলে যেতে পারতেন। শুধু শুধু হেঁটে হেঁটে এতোদূর এলেন।
— ধুর ভাই রাখেন তো। কতদিন পর আপনার সঙ্গে দেখা। কিছুটা সময় থাকি একসঙ্গে। এমন করেন কেন ভাই?
আমরা প্রায় ঘণ্টাখানেক বসি চায়ের দোকানে। টুকটাক না বিষয়ে কথা হয়। এক পর্যায়ে বলি— জহির ভাই তাহলে উঠি। আবার দেখা হবে নিশ্চয়।
— জি ভাই দেখা হবে।
চলে যেতে যেতে পেছন ফিরে জহির ভাই বলেন— ভাই আপনাকে খুব ভালোবাসি। আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসি। আর মনে মনে বলি— সারাজীবন কিচ্ছু চাইনি আমি ভালোবাসা ছাড়া!
ভিওডি বাংলা/এম







