• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

সিআইডির মামলা

১২১ কোটি টাকা পাচার, পানামা পেপারসেও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নাম

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২৬ জুন ২০২৬, ০৪:১৭ পি.এম.
ফ্যাশন কমফোর্ট লিমিটেডের এমডি আফজালুর রহমান
ফাইল ছবি

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের আরেকটি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ফ্যাশন কমফোর্ট বিডি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে বিদেশে পাচার করেছে ১২১ কোটি টাকা। আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভারশিপমেন্টের মাধ্যমে এই জালিয়াতির আশ্রয় নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে, পানামা পেপারসে এসেছিল প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. আফজালুর রহমানের নাম।

প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি করা পণ্য এবং দেশে আসা টাকার হিসাব পর্যালোচনা করার মধ্য দিয়ে অর্থ পাচারের ঘটনা বেরিয়ে আসে। পাচারের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের অন্তত চারটি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে জাল নথিপত্র তৈরি করেছিল তারা।

দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে গত বুধবার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ফ্যাশন কমফোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফজালুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী সালমা রহমানকে আসামি করা হয়।

ফ্যাশন কমফোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে আছেন সালমা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বহুল আলোচিত পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসা ৬৯ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আফজালুর রহমান ছিলেন। সিআইডি বলছে, পানামা পেপারসে নাম রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে আফজালুর রহমানই প্রথম, যাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান শেষে মামলা করেছে সিআইডি। পানামা পেপারসে নাম রয়েছে এমন আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তবে ফ্যাশন কমফোর্টের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলায় পানামা পেপারসের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগেও বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোর একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্যের দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হয়ে থাকে।

ফ্যাশন কমফোর্টের ১৫৬টি পারচেজ কন্ট্রাক্টের (ক্রয় চুক্তি) নথিপত্র যাচাই করা হয়। সেখানে উঠে এসেছে, কৌশলে নতুন পণ্যকে স্টকলট হিসেবে দেখিয়ে কম মূল্যে রপ্তানি করেছে। এই জালিয়াতিতে অন্তত চারটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের নামে জাল নথিপত্র তৈরি করেছে ফ্যাশন কমফোর্ট। তারা দাবি করেছিল, বাংলাদেশের এসব প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের অন্যতম উৎস ছিল। তদন্ত সূত্র বলছে, ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশে আসে। তবে রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্য ১৫০ কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি পণ্যের মূল্য ৫ ভাগের এক ভাগ দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়।

মামলার তদারক কর্মকর্তা ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার এহসানুল কবির সমকালকে বলেন, গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে জাল নথিপত্র তৈরি ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ফ্যাশন কমফোর্ট অর্থ পাচার করেছে। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তদন্তে বের হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম পানামা পেপারসেও ছিল।

আন্ডার ইনভয়েসিং হলো আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের একটি প্রতারণামূলক কৌশল, যেখানে চালানে পণ্য বা পরিষেবার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দাম উল্লেখ করা হয়।

ফ্যাশন কমফোর্টের ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তারা।  যারা গুণমান, নির্ভরযোগ্যতা এবং দায়িত্বশীল উৎপাদনকে গুরুত্ব দেয় এমন সব ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে। মামলার এজাহার ও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে তাদের ঢাকার কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে মহাখালী নিউ ডিওএইচএসের কথা উল্লেখ আছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েসাইটে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মোবাইল নম্বর রয়েছে। সেই নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠানোর পরও সাড়া মেলেনি।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ফ্যাশন কমফোর্টের নামে এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় খোলা হিসাব নম্বর ব্যবহার করে ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত ১৫৬টি পারচেজ কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জালিয়াতি করে পোশাক সামগ্রী পাঠানো হয়। নথিপত্রে বাংলাদেশে যেসব প্রতিষ্ঠানকে এসব পণ্যের উৎস বলে তারা উল্লেখ করেছে, তা সঠিক ছিল না। ফ্যাশন কমফোর্ট দাবি করেছিল, গ্রিন ট্যাক্স, আওয়ার ফ্যাশনসহ চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে তারা এসব পণ্য নিয়েছিল। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফ্যাশন কমফোর্টের এ ধরনের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন নেই। উল্টো রপ্তানির ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের নামে জাল নথিপত্র তৈরি করেছিল। যেসব কর্মকর্তার স্বাক্ষর সেখানে ছিল সেটি জাল।

সিআইডি সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তকালে আনুষ্ঠানিকভাবে অনেকের বক্তব্য নিয়েছেন। আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভারশিপমেন্টের মাধ্যমে মোট ১২১ কোটি ২৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৫ টাকা প্রতিষ্ঠানটি পাচার করেছে। পণ্য বিক্রির যে মূল্য দেখানো হয়েছে তার চেয়ে অন্তত কয়েক গুণ অর্থ তারা হাতে পেয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে এইচএস কোড পর্যালোচনা করা হয়েছে। এছাড়া ফ্যাশন কমফোর্টের মালিকানাধীন আরও একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেটির নাম আসদোয়া ফ্যাশন। এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আফজালুর রহমানের নাম রয়েছে। ফ্যাশন কমফোর্টের মহাখালী অফিসের ঠিকানায় আসদোয়ার ঢাকার কার্যালয়।

অর্থ পাচার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে টাকা বেরিয়ে যায় দুই উপায়ে। একটি হচ্ছে, পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার। আরেকটি উপায় হলো পণ্য রপ্তানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো। এমনকি অনেক সময় খালি কন্টেইনার যাওয়া-আসা করেছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে।

মোসাক ফনসেকা নামে পানামার একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের এক কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি ফাঁস হয় ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। নথিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নিকটাত্মীয়দের নাম আসে। এ তালিকায় আরও আছে সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদ, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের এক ছেলে এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দুই ছেলে ও এক মেয়ের নাম।

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নাম আসার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক।

অন্যদিকে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্যারাডাইস পেপারসের প্রায় ২৫ হাজার নথি প্রকাশ করা হয়। সেখানে ফাঁস হয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর অনেক ব্যক্তির গোপন তথ্য। ১২০ জন রাজনৈতিক নেতা এ তালিকায় রয়েছেন।

ভিওডি বাংলা/এফএ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকাকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে কাজ করছে সরকার: মীর শাহে আলম
ছবি: সংগৃহীত
দুই-একদিনের মধ্যে মাদক আইনের সংশোধনী উপস্থাপন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
শোডাউন ও মিছিল থেকে বিরত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর