মেলার মানুষ
কৃত্রিম কি ছাড়িয়ে যাবে আসল?

খান মুহাম্মদ রুমেল
নানা কারণেই এবারের বইমেলা আলোচনায় আছে। বলা চলে নানা নেতিবাচক বিষয়ে এবারের বই নিয়ে কথাবার্তা বেশি। মেলার সময় যত গড়িয়েছে— যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অনুসঙ্গ। বাংলা একাডেমি বেশিরভাগেরই কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। পারেনি সুষ্ঠু মীমাংসা দিতেও। তারা কেবল আপাত সামাধান দিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এগুলোকে সমাধান না বলে এড়িয়ে যাওয়াও বলা যায়। তারপরেও চলছে মেলা। মানুষ আসছেন। বই কিনুক আর না কিনুক মেলার মাঠে পদচিহ্ন তো পড়ছে! হয়তো বাংলা একাডেমি এতেই স্বান্তনা খুঁজছে! আমিও হয়তো আসতে হয় বলেই আসছি।
মঙ্গলবার মেলার ১৮ তম দিন। সন্ধ্যার আগে আগে মেলায় ঢুকি। এলোমেলো পা ফেলে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে কানে আসে দুই তরুণের আলাপ। আটিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আলাপ করছে তারা। একজন বলছে— সামনের দিনে এইসব লেখক টেখক বইমেলা এসব কিছুই থাকবে না।
বই লিখবে AI. আর এসব ছাপা বইও মানুষ পড়বে না। মানুষ ঝুঁকবে ইবুকের দিকে। পিএিডএফ পড়বে মানুষ।
— ধুর রাখ তোর এসব আজাইরা পেঁচাল। ছাপা বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। যত কিছুই আসুক দুনিয়ায়, বইয়ের জায়গায় বই থেকে যাবে। আসলে সৃষ্টিশীলতা জায়গাটা কেউ নিতে পারে না। মৌলিক শিল্পের জন্য মানুষই অদ্বিতীয়।
— আচ্ছা দেখবো! কার কথা ঠিক হয়।
একবার ইচ্ছে করে তাদের সঙ্গে আলাপে অংশ নিই। পরে মনে হলো এটা ঠিক হবে না। যেচে কথা বলতে গেলে তারা কিভাবে নেবে কে জানে! ফলে দাঁড়াই না। হাঁটতে থাকি নিজের মতো। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মনে মনে একটা লেখা সাজাই এ বিষয়ে। দৃশ্যটা এমন ভাবি— যেন কোনো ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছি। আর সামনে বো শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে আমার কথা।
২০২৫’র আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছি— পৃথিবী প্রবেশ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিসরে। বলা হচ্ছে আগামীর পৃথিবীতে রমরমা থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। কিন্তু ব্যাপারটি যদি হয় সাহিত্য? মৌলিক সৃষ্টিশিীলতার চর্চা AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে কতটুকু সম্ভব? আসছি সে আলোচনায়। তার আগে একটু বলতে চাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। যে বুদ্ধিমত্তাকে বলাই হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম। তো, কৃত্রিম জিনিসের সক্ষমতা আর কতটুকু। কিংবা কৃত্রিম কি কখনো প্রাকৃতিককে ছাড়িয়ে যেতে পারে? সোজাভাবে দেখলে পারে না। পারার কথা নয়। তাই বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমুত্তাকে খাটো করে দেখারও কিছু নেই। কারণ তার পেছনে কাজ করে কিন্তু মানুষ। যে মানুষকে ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে সবাই স্বীকৃতি দিয়েছে সৃষ্টির সেরা বলে। সুতরাং যার পেছনে মানুষ আছে, কিংবা মানুষের আবিস্কৃত কোনো জ্ঞান বা অর্জনকে কিছুতেই হেলাফেলার উপায় নেই। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান সময়ে AI অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুরুতে যে বলছিলাম সাহিত্যের কথা। কবি লেখকদের নিজস্ব ভাবনা এবং দর্শনের নির্যাস একেকটি কবিতা গল্প কিংবা উপন্যাস।
মানুষের অমিত প্রতিভায় লেখা হয়েছে গীতাঞ্জলি, শেষের কবিতা, ফাউস্ট, ওয়ার অ্যান্ড পিস, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, পদ্মা নদীর মাঝি, দিবারাত্রির কাব্য, জোছনা ও জননীর গল্পের মতো অমর সব লেখা। আচ্ছা জীবনানন্দ যে লিখেছেন— হায় চিল সোনালি চিল এই ভিজে মেঘের দুপুরে তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে। কিংবা লালন সাঁইয়ের লেখা— জাত জাত গেলো বলে… একি আজব কারখানা…সত্য কাজে কেউ নয় রাজি… সবই দেখি তা না না না…। এমন অমিয় পঙক্তিতিমালা লিখতে যে চিন্তার পরিসর, যে দার্শনিক বোধ দরকার— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সর কি তা আছে? আবদুর রহমান বয়াতী গেয়েছিলেন— মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি বানাইয়াছেন কোন মিস্তিরি…. মন আমার দেহঘড়ি…একখান চবি মাইরা দিসে ছাইড়া… চলতেয়াসে জনম ভইরা… মন আমার দেহঘড়ি…। এই যে দেহঘড়ি বানানোর পর চলছে জনম ভর! কে বানিয়েছেন এই দেহঘড়ি কিংবা মানুষ? বনিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কিংবা ঈশ্বর। তো, মানুষের মাথার ভেতর মনের ভেতর সারাক্ষণ কোন চিন্তা খেলা করে, কোন ভাবনায় মশগুল থাকেন মানুষ— তা বোঝার সাধ্য আছে কার? আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের অনেক আবিস্কার এসেছে পৃথিবীতে। নতুন নতুন জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েছে পৃথিবী।
কিন্তু কোনো আবিস্কার কিংবা জ্ঞান কি মানুষের মনের খবর দিতে জানতে পেরেছে আজও? পারেনি। আর পারেনি বলেই এখনো অধরা মানুষের মনের জানালা। এ তো গেলো সাধারণ মানুষের কথা। যারা সৃষ্টিশীল— যারা শিল্পের চর্চা করেন, সাহিত্য করেন তাদের মনের খবর ভাবনার খবর বোঝা তো আরো কঠিন। শুধু কঠিন নয় বলতে গেলে অসম্ভব। সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI— এর সাধ্য কি সাহিত্যে রাজত্ব করবে?
যখন রোবট আবিস্কার হলো অনেকের আশঙ্কায় ছিলো এবার হয়তো মানুষ বেকার হয়ে যাবে। মানুষের স্থান দখল করে নেবে রোবট। কিন্তু আদতে দেখা গেলো কি? রোবট মানুষকে পরাজিত করতে পারেনি। বরং মানুষের সহায়ক হিসেবে রয়ে গেছে। কাজ করে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বেলায়ও তাই হবে। মানুষের সৃষ্টিশীলতার চর্চায় সহায়ক হবে সে।
থাকবে মানুষের সহোযোগী হয়ে। হ্যাঁ সায়েন্স ফিকশন কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখার সময় রোবটরা যেমন চরিত্র হিসেবে আসে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও হয়তো তেমন আসবে মানুষের লেখায়। আবার গড়পড়তা কিছু মানুষ হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লিখবেনম বলবেন কিছু কিছু। কিন্তু সেগুলো হবে ঠেকা চালানোর কাজ। সাময়িক দায় সারার কাজ। আদি এবং নির্ভেজাল যে সাহিত্য কিংবা সৃষ্টিশীলতা— সেটি কখনোই মানুষের প্রকৃত বুদ্ধিকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না কৃত্রিম বুদ্ধি। মুল কথা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের আবিস্কার। নিজের আবিস্কার কখনো নিজেকে ছাড়িয়ে যাবে, নিজেকে হুমকির মুখে ফেলবে— মানুষ কখনোই এমনটা হতে দেবে না। কারণ মানুষ খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। বুদ্ধিই তাকে পথ দেখাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার।
তবুও AI কে স্বাগত। কারণ নতুন কোনো আবিস্কার মানেই নতুন চিন্তার জগত খুলে দেয়া । মানুষ মূলত নতুনত্বে বাঁচে।
হাঁটা পথে দেখা হয়ে যায় স্বকৃত নোমানের সঙ্গে।
— একা একা কি বিড়বিড় করছেন কবি? হাসি ঝরে স্বকৃত নোমানের মুখে।
— নাহ তেমন কিছু না। আচছা ভাই বলেন তো সামনের দিনে ছাপা বইয়ের ভবিষ্যৎ কি? সামনে কি ডিজিটাল বই বাজার দখল করে নেবে?
— ডিজিটাল বই কিংবা পিডিএফ বই আমাকে কখনো টানে না। আমি এখনো ক্ল্যাসিকেই আছি। বই ক্ল্যাসিক। চিরায়ত। কখনো এর মৃত্যু হবে না। আমৃত্যু আমি বইয়ের সঙ্গেই থাকবো।
— বুঝলাম।
— আচ্ছা ভাই যাই একটু কাজ আছে।
চলে যান স্বকৃত নোমান। আমিও মেলা থেকে বের হয়ে যাবো বলে ঠিক করি। শরীরটা ভালো লাগছে না। ক’দিন ধরে হালকা জ্বর জ্বর লাগছে।
ভিওডি বাংলা/এম







