• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

মেলার মানুষ

আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই কবি…

   ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০৬:৩৮ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

আজ জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন। মেলায় ঢুকে আমি কবিকে খুঁজি। মুক্তমঞ্চের সামনে খুঁজি। বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে খুঁজি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বটগাছতলায় খুঁজি। লেকের জলে খুঁজি। মেলার মানুষের ভিড়ে খুঁজি। ধূসর আকাশে খুঁজি। বইয়ের স্টলে খুঁজি। শিশু চত্বরের পলাশ গাছে খুঁজি। বসন্ত বাতাসে খুঁজি।  হেঁটে চলা মানুষের কলকাকলিতে খুঁজি। সোনালি ডানার চিলে খুঁজি। বিকেল শেষের গোধূলি আলোয় খুঁজি। কোথাও নেই তিনি! কবির দেখা মেলে না।

মনে পড়ে জীবনান্দের খোঁজে এক ভোরে নেমেছিলাম তার শহরে। জাহাজ থেকে নামতেই আধসেদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো কমলা রঙ একটা সূর্য স্বাগত জানিয়েছিলো আমাকে। আর হাজার বছরের কুয়াশায় ঢেকে দিয়ে চরাচর, বলেছিলো— স্বাগমত। এরপর সারাটি দিন বিবির পুকুর। বগুড়া রোড, রূপাতলি, সন্ধ্যানদী, জলাঙ্গির ঢেউয়ে ভাসা কলমিলতা, কাঞ্চনফুল অলস দুপুর, ঘুঘুর ডাক, হলুদ পায়ের শালিক— আরো কত জায়গায় তন্নতন্ন করেছি তাকে। এরপর আবার গিয়েছি, বারবার গিয়েছি। খু এই তো মাস ছয়েক আগে গিয়েছিলাম জীবনান্দের খোঁজে বরিশাল শহরে। কীর্তনখোলার পাড়ে যেমন খুঁজেছি তাকে, খুঁজেছি ব্রজমোহন কলেজের সবুজে, কলেজের পুরনো লাল বিল্ডিংয়ে শিক্ষকদের বসার জায়গায়। শীতলাখোলার সেই নির্জন বগুড়া রোড এখন হয়ে গেছে জীবনানন্দ দাশ সড়ক। কোথায় সেই নির্জনতা। কোথায় সেই গোলপাতায় ছাওয়া ঘর। কোথায় বাড়ির পেছনের সেই লেবু বাগান। চারপাশে শুধু ইটের দঙ্গল। পাইনি, আমি কোথাও পাইনি জীবনানন্দের দেখা।

আজ কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। পরিচিত কারো খোঁজও মেলে না। আমি একা একা হাঁটি। নির্জনতা খুঁজি। কিন্তু মেলার মাঠে নির্জনতা কোথায়? অথবা মেলায় গিয়ে নির্জনতা খোঁজা বোকামি ছাড়া আর কি! সবাইকে এড়ানো গেলেও মেলায় গিয়ে কি আর মনি ভাইয়ের চোখের আড়ালে থাকা সম্ভব?
—    কি হ্যান্ডসাম? একা একা কি করো? মনি ভাইয়ের মুখে সেই চিরচেনা হাসি। আমাদের বন্ধু কবি পিয়াস মজিদ বলে— মনি ভাইয়ের ভর্তুকি দেয়া হাসি।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূব মাথায় বিশাল বিশাল উর্ধ্বমুখি বেশকিছু গাছ। এক প্রিয় মানুষ বলেছিলো এগুরো পাম গাছ। আরো নানা গাছ গাছালিতে ভরা। এদিকটা সব সময় নির্জন থাকে বলে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। মনি ভাই এখানেও এসে হাজির।
—    কিছু করছি না ভাই। আজ জীবনান্দের জন্মদিন।
—    ওহ তাই তো!
—    ভাই জীবনানন্দের পুরো জীবনটাই আমার কাছে একটা মহাকাব্য।
—    নিশ্চয় মহাকাব্য। তার মতো প্রভাব বাংলা কবিতায় রাখতে পেরেছেন আর ক’জন?
—    জি 
—    তুমি থাকো। আমার একটু কাজ আছে।
চলে যান মনি ভাই। মেলায় যত দিন দেখি কখনো ব্যস্ততাহীন দেখি না তাকে। সারাক্ষণই কোনো না কোনো কাজ নিয়ে আছেন। কারো না কারো সঙ্গে কথা বলছেন। তার মতো প্রাণময় মানুষ জীবনে আমি কমই দেখেছি।

মনি ভাই চলে গেলে আমার মাথায় আবার ভর করে জীবননান্দ। আমার মনেহয় কি ভীষন নির্জন আর ব্যথিত জীবন ছিলো তার। 
জীবনানন্দ দাশ, যিনি জন্মেছিলেন এক উচ্চবংশে, কিন্তু পুরো জীবন কাটিয়ে দিলেন হতদরিদ্রতার আঁধারে। বিয়ে করলেন লাবণ্যকে, যে হয়তো ঘরমুখো ছিল, কিন্তু স্বপ্ন ছিল তার আকাশছোঁয়া। চাকরিবিহীন জীবন আর স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধনহীন সম্পর্কের মাঝেও  জীবনানন্দ খুঁজে বেড়ালেন এমন একজন, যে তার মনের গভীরে পৌঁছাতে পারবে, অন্ধকারে আলো ছড়িয়ে দিবে। এই হাহাকার আর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লিখলেন বনলতা সেন। 

মনের মধ্যে বিষন্নতা আর সংসারের টানাটানির পরেও বাংলার মাটি আর হৃদয়ের সঙ্গে তার প্রেম ছিল অফুরন্ত। কখনো সুদর্শন, আবার কখনো লক্ষ্মীপেঁচা হয়ে এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। 

অবিশ্বাস্যভাবে, পৃথিবীতে ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া একমাত্র মানুষ জীবনানন্দই। এখন তিনি স্বেচ্ছায় প্রাণ দিলেন নাকি আসলেই দুর্ঘটনার শিকার? আজ ঠিক সেই প্রহেলিকার দিন। তার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবন আর আনন্দ, কিন্তু সারা জীবন কী পেলেন তিনি—দুঃখ ছাড়া?
আমার মাঝে জানতে ইচ্ছে করে ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর দিনটা কেমন ছিলো? কলকাতার আকাশে সেদিন উড়ছিলো কি নিঃসঙ্গ কোনো চিল?

জীবনানন্দ ভালোবেসেছিলেন কাকাতো বোন শোভনাকে।  জীবনানন্দ গবেষক গৌতম মিত্র বলছেন—যেখানে যেখানে শোভনা গেছেন পেছন পেছন গেছেন জীবনানন্দ। ১৯৩২ সাল। ডায়াশেসন কলেজের ছাত্রী শোভনা, কত-ই বা বয়স তখন শোভনার, ১৮-র বেশি তো নয়, জীবনানন্দ ৩৩ বছরের বিবাহিত যুবক। অন্ধ  দারোয়ানের হাতে স্লিপ পাঠিয়ে নিচে বসে অপেক্ষা করতেন, কখনো ইচ্ছে হলে শোভনা দেখা করতেন, কখনও করতেন না।
১৯২৯ সাল । ডিব্রুগড়ে ক্লাস নাইনের ছাত্রী শোভনা। বেকার জীবনানন্দ চাকরির খোঁজে সেখানে গিয়েও উপস্থিত। দরজা বন্ধ করে শোভনাকে কবিতা শোনাচ্ছেন। শোভনার মা, জীবনানন্দর কাকিমা, সরযূবালা দাশ রাগ করছেন, তবুও।
সবাই মিলে শিকারে গেল,। শোভনার বাবা অতুলানন্দ পেশায় ফরেস্টার, আইএফএস, জীবনানন্দ লেখাপড়ার আছিলায় শিকারে গেলেন না, শোভনাও শরীর খারাপের বাহানায় থেকে গেলেন।সারা রাত।
ডিব্রু নদীর ধারে বলে শহরের নাম ডিব্রুগড়। এই শহরেই এক দিশাহীন ও অনির্দিষ্ট প্রেমে দুজনে জড়িয়ে পড়লেন।যা সারাজীবন ধরে জীবনানন্দর লেখার প্রধান চালিকাশক্তির হিসেবে কাজ করেছে।
নিচের কবিতাটিও তারই প্রমাণ।আসলে কোনও আড়াল নেই জীবনানন্দর রচনায়।একমাত্র ভালোবাসার আড়াল ছাড়া।
বিমূঢ় রক্তের উত্তেজনায় পাখি যেভাবে পাখিনীকে পায় জীবনানন্দ দাশও কি সেভাবেই তাঁর প্রেমিকাকে কামনা করেছিলেন।
 ‘এই তো সেদিন
ডিব্রু নদীর পাড়ে আমরা ঘুরছিলাম
মনে হয় যেন হাজার বছরের ও-পারে চলে গিয়েছ তুমি
শুধু অন্ধকারে বাবলাফুলের গন্ধ যখন পাই
কিংবা কখনও-কখনও গভীর রাতে ঘাস মাড়িয়ে
তারার আলোয় সেই ব্যথিত ঘাসের শব্দ যখন শুনি
রক্তের বিমূঢ় উত্তেজনায়
তখন তোমাকে আমি পাখির কাছে পাখিনীর মত পাই।’
শোভনা তখন শিলঙে।কোনও একটা স্কুল বা কলেজে পড়াচ্ছেন।জীবনানন্দ সেখানেও গিয়ে হাজির।১৯৪৭/৪৮ অবধি জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও গল্প উপন্যাসে যে জোয়ার, তা অনেকটাই শোভনার জন্য। শোভনা সরাসির গল্প উপন্যাস ও কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের পরিবারকে একটা ছোটখাটো বিশ্ব বলা যায়।বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন চরিত্রের মানুষজন সেখানে। জীবনানন্দ দাশের বেশিরভাগ গল্প উপন্যাস ও কবিতার রশদ এই মানুষজন।

মা বাবা কাকা ভাই থেকে শুরু করে পিসিমা ও প্রেমিকা অবধি কে নেই এইখানে। ভাঙনটা শুরু হয়েছিল আগেই।১৯৫০-এর পর শোভনা যখন জীবনানন্দর ল্যান্সডাউনের ভাড়া বাড়িতে যাচ্ছেন, তখন ঢুকবার বা বেরোবার সময় একবার মিলুদার ঘরে মুখটা বাড়িয়ে দেখছেন মাত্র। মূল কথাবার্তা বা আড্ডাটা হচ্ছে লাবণ্য বৌদির সাথে।শোভনা নিজে  একথা জানিয়েছেন জীবনানন্দ গবেষক গৌতম মিত্রকে।জীবনানন্দও ১৯৪৮-এর পর আর তেমন লিখছেন কি!
এতটাই হতাশ জীবনানন্দ যে বারবার তাঁর ডায়েরিতে Y তথা বেবি তথা শোভনা-কে হেরোদিয়াসের কন্যা রূপে উল্লেখ করেছেন।
ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘আমার frustration-এর কারণ এই Herodias’s Daughter’।
কে এই হেরোদিয়াসের কন্যা? বাইবেলের চরিত্র রাজা হেরোদ ও রানী হেরোদিয়াসের মেয়ে সালোমে।সালোমে অবশ্য হেরোদিয়াসের প্রথম স্বামী ফিলিপের ঔরসজাত। ফিলিপের রোমে যাওয়ার সুযোগে হেরোদ ও হেরোদিয়াসের সম্পর্কের এই অনাচার মেনে নিতে পারেননি সন্ত জন দ্য ব্যাপটিস্ট।তিনি প্রকাশ্য জনসভায় এই কথা প্রচার করতে লাগলেন।জন দ্য ব্যাপটিস্টকে বন্দী করা হল।কিন্তু বন্দী করা হলেও জনের বাণীর এমন আকর্ষণ যে লুকিয়ে রাজা হেরোদ সন্তর বাণী শুনতে কারাগারে যেতেন।
এটা স্বৈরিণী রানী হেরোদিয়াস টের পেয়েছিলেন।তিনি পথের কাঁটা দূর করতে মেয়ে সালোমেকে নৃত্য পরিবেশন করে তার সৎ বাবা হেরোদকে তুষ্ট করতে বললেন।এবং সৎ মেয়ের নৃত্যে হেরোদ সন্তুষ্ট হলে হেরোদিয়াসের পরামর্শ মতো সালোমে জন দ্য ব্যাপটিস্টের কাটা মাথা উপহার চাইলেন।
গল্প এতটুকুই।
যুগে যুগে অসংখ্য গল্প- কবিতা-চিত্র-সঙ্গীত-সিনেমা সালোমেকে নিয়ে রচিত হয়েছে।বিশেষত অসকার ওয়াইল্ডের ‘সালোমে’ নাটকটির কথা উল্লেখ করতেই হয় কারণ জীবনানন্দ দাশ নিশ্চয় নাটকটি পড়েছিলেন।তাছাড়া জীবনানন্দর বাইবেল প্রীতির কথা আমরা জানি।অসকার প্রীতিও জানি।দীর্ঘ লেখা আছে।
দুটো দিক আছে এই তুলনার। এই উপকথার আড়ালে জীবনানন্দের অভিপ্রায় বোঝা কষ্টকর নয়। তাঁর পারিবারিক জীবনে হেরোড, হেরোডিয়াস, সালোমে বলতে কাদের বুঝিয়েছেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কর্তিত মুণ্ড জন দ্য ব্যাপটিস্টের জায়গায় জীবনানন্দ দাশ কল্পনা করেছেন পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতায় বলিদত্ত আপন সত্তাকে।আসলে Y- এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জেরে সৃষ্টি হওয়া টানাপোড়েনে Y -এর মা ও বাবাও এই উপকথায় জড়িয়ে গেছেন।
আরেকটা দিকও আছে।সেটা মানুষের অপূর্ণতার দিক।এই গল্প আমাদের শেখায় হেরোদ এখানে জনের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রায় পূর্ণ হতে হতেও হলেন না।
বাইবেলে আছে:
এখন প্রায় বিশ্বাস করতে রাজি হয়েছিলে;
খ্রীষ্টকে গ্রহণ করতে প্রায় রাজি হয়েছিলেন;
সহায়ক প্রায় হতে পারে না! প্রায় কিন্তু ব্যর্থ!
দু:খ, দুঃখ যা তিক্ত বিলাপ, প্রায় কিন্তু ব্যর্থ!
জীবনানন্দ দাশ সারাজীবন এই তিক্ততার পথেই তাঁর ঈপ্সিত লক্ষে পৌঁছাতে চেয়েছেন।অন্তত জীবনের শেষ দিকে।
কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছুতে পেরেছিলেন কি জীবনানন্দ দাশ? 
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। জ্বলে উঠেছে নিয়ন বতি। আমি ধীর পায়ে বের হয়ে আসি মেলা থেকে। মাথার ভেতর বাজতে থাকে— 

পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
 প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন 
 মরে যেতে হয়!

ভিওডি বাংলা/এম 


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়