যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি খুন: পরিবারের স্বপ্ন এখন শোকে পরিণত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে তাদের গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের স্বপ্ন, আত্মীয়-স্বজনের আশা আর গ্রামের মানুষের গর্ব-সবকিছুই যেন মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এই দুই তরুণ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায়।
ফ্লোরিডার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি করছিলেন জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। গত ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ থাকার পর গত শুক্রবার লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। অন্যদিকে বৃষ্টির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলেও তার মরদেহ এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জামিল আহমেদ লিমনের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাথান এলাকায়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সবার চোখে জল, মুখে একই প্রশ্ন-কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল?
লিমনের বাবা জহুরুল হক দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের মাওনা এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সেখানেই লিমনের বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা। দুই ভাইয়ের মধ্যে লিমন ছিলেন বড়। পরিবারের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন তিনি।
স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই লিমন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। পড়াশোনার প্রতি ছিল গভীর মনোযোগ। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে বড় কিছু করবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে গভীর শোকে।
লিমনের চাচা জিয়াউল হক বলেন, “জামিল আমাদের পরিবারের গর্ব ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিল। তার এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
অন্যদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুরে। তার মৃত্যুর খবরেও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী বৃষ্টির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ভিড় করছেন।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মিরপুরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। একটি বেসরকারি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মেয়ের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কথা হতো। শেষবার কথা হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে কাজ করছিল। এরপর থেকে ফোন বন্ধ পাই। পরে পুলিশ জানায়, আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই।”
তিনি বলেন, “আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। সে সবসময় পড়াশোনায় ভালো ছিল। আমরা কখনো ভাবিনি এমন খবর শুনতে হবে।”
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টি ঢাকার নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি এবং শহীদ বীরউত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হলেও ফুল স্কলারশিপ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডির সুযোগ পান। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান।
বৃষ্টির স্বজনরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তিনি ছিলেন গর্বের নাম। তার এমন মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছেন না।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন বলেন, “বৃষ্টি আপু খুব ভালো মানুষ ছিলেন। পরিবারের সবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিক। কী কারণে তাকে হত্যা করা হলো, তা জানতে চাই। আমরা বিচার চাই।”
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, বিষয়টি দূতাবাসের মাধ্যমে দেখভাল করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা চাইলে প্রশাসন তা দেবে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন লিমন ও বৃষ্টি। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের সর্বশেষ দেখা যায়। তদন্তের একপর্যায়ে স্থানীয় পুলিশ হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামে ২৬ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত হিশাম লিমনের রুমমেট ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে দুই হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এটি ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন।
দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু দুই পরিবার নয়, শোকাহত গোটা সমাজ। স্বজনদের একটাই দাবি-দ্রুত ঘটনার পূর্ণ রহস্য উদঘাটন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষ বিদায় জানানোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দুই পরিবার।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







