• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস, ঐক্য, সংস্কৃতি ও নবজাগরণের চিরন্তন প্রতীক

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩০ এ.এম.
লাল-সাদার রঙে, গান-নৃত্যে ও ঐতিহ্যে বরণ করা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ-ছবি-ভিওডি বাংলা

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, বাঙালির প্রাণের উৎসব-বাংলা নববর্ষ। সময়ের পরিক্রমায় এটি শুধু একটি দিন বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাঙালির ঐক্য, সংস্কৃতি ও নবজাগরণের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই দিন অতীতের ঐতিহ্যকে স্মরণ করায়, বর্তমানকে আনন্দে উদযাপন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালিরাও উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেন। ফলে পহেলা বৈশাখ এখন আর কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলা সনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো-এর সূচনা হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে। যেখানে হিজরি সন চাঁদের হিসাব অনুযায়ী এবং খ্রিস্টীয় সন মধ্যরাতে শুরু হয়, সেখানে বাংলা সনের শুরু ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয়। তাই শিশিরভেজা সকালে নতুন সূর্যকে বরণ করেই শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলা সনের উৎপত্তি মোগল আমলে। সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এই সনের প্রবর্তন করেন। তার নির্দেশে জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর ও হিজরি সনের সমন্বয়ে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন, যা ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ সালে চালু হওয়া এই সনই পরবর্তীতে বাংলা সনে রূপ নেয়।

তবে শুরুতে পহেলা বৈশাখ আজকের মতো আনন্দঘন ছিল না। এটি ছিল মূলত কৃষকদের খাজনা পরিশোধের দিন। জমিদারদের ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানে প্রজাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও দিনটি ছিল দায়মুক্তির প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনে এই দিনটি এখন সর্বজনীন আনন্দোৎসবে পরিণত হয়েছে।

দেশভাগের পর বাংলা পঞ্জিকার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে সংস্কার কাজ শুরু হয়। পরে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ১৯৮৮ সালে সরকারি ব্যবহারে বাংলা সাল চালু হলে এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পায়।

বাংলা বছরের ১২ মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রের অবস্থানের ভিত্তিতে-বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। এটি বাংলা সনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিরও পরিচায়ক।

সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের উদযাপন পেয়েছে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে নগরজীবনে এই উৎসব এখন আরও বর্ণিল ও জাঁকজমকপূর্ণ। ভোরে খোলা প্রান্তর, উদ্যান বা সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণে মানুষ জড়ো হয় সূর্যকে স্বাগত জানাতে। শিল্পীদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে নববর্ষের গান, আর লাল-সাদা পোশাকে তৈরি হয় উৎসবের আলাদা আবহ।

খাবারের ক্ষেত্রেও নববর্ষে এসেছে বিশেষ ঐতিহ্য। পান্তা-ইলিশ এখন এই দিনের প্রতীকী খাবার হিসেবে পরিচিত। যদিও অতীতে এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ খাবার, সময়ের সঙ্গে এটি বাঙালির উৎসব সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর সর্বজনীনতা। একসময় কৃষক ও ব্যবসায়ী সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এটি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উৎসব। শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই দিনে মিলিত হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও এই উৎসবকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

পার্বত্য অঞ্চলে ‘বৈসাবি’সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসব নববর্ষ উদযাপনের অংশ। এসব আয়োজন পহেলা বৈশাখের সার্বজনীনতাকে আরও বিস্তৃত করে।

কালের পরিবর্তনে অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও কিছু এখনো টিকে আছে। চট্টগ্রামের বলীখেলা বা রাজশাহীর গম্ভীরা আমাদের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

বর্তমানে নববর্ষের সকালে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়েই উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হয়। উদ্যান, লেকপাড় বা বৃক্ষতলে মানুষের সমাগমে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণীরা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

তবে পান্তা-ইলিশের জনপ্রিয়তার সঙ্গে একটি উদ্বেগও রয়েছে। অতিরিক্ত জাটকা নিধন ভবিষ্যতের ইলিশ সম্পদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এ কারণে সরকার নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নববর্ষের আনন্দের পাশাপাশি এ বিষয়ে সচেতন হওয়াও জরুরি।

এদিকে নববর্ষ উপলক্ষে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে তারা আর্থিক সুবিধা ও সহায়তা পাবে-যা কৃষি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন বছরের প্রারম্ভে প্রত্যাশা-দেশ ও জাতির কল্যাণ, মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাক-এই হোক পহেলা বৈশাখের অঙ্গীকার।

ভিওডি বাংলা/জা
 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বৈশাখী শোভাযাত্রায় প্রাণের উচ্ছ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা রুখে দেওয়ার শপথ
বৈশাখী শোভাযাত্রায় প্রাণের উচ্ছ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা রুখে দেওয়ার শপথ
বর্ষবরণে গান-নৃত্যে মুখর ঢাবির বটতলা
বর্ষবরণে গান-নৃত্যে মুখর ঢাবির বটতলা
কৃষক কার্ড উদ্বোধনে টাঙ্গাইলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
কৃষক কার্ড উদ্বোধনে টাঙ্গাইলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী