সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লো অধ্যক্ষ্যের ঘুষ, কলেজ না করার দৃশ্য

আওয়ামী লীগ আমলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বিসিএস কর্মকর্তা মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিনকে জুলাই পরবর্তী সরকার প্রথমে ওএসডি এবং পরে বাগেরহাটের চিতলমারি সরকারি মহিলা ডিগ্রী কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে বদলি করে। সেই থেকেই তিনি থাকছেন ঢাকায় কোটি টাকার নিজস্ব ফ্ল্যাটে। ইচ্ছে হলে মাসে দু-এক দিন বাগেরহাটে কলেজে যান।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ দপ্তরে উপস্থিত থাকার ঘোষণা দেয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে গত সোমবার (৬ এপ্রিল) তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। ওইদিনসহ বেশ কিছু দিন তার চেয়ার খালি থাকার ভিডিও এসেছে ভিওডি বাংলার কাছে। এর আগে বৃহস্পতিবার, বুধবারও তার চেয়ার খালি দেখা গেছে ভিডিও ফুটেজে।

৩১ মার্চ সকাল ১০টা ৩ মিনিটের আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কলেজটির অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক বর্ণালী মন্ডলের কাছ থেকে কিছু একটা নিচ্ছেন অধ্যক্ষ। এরপর তিনি চেয়ার থেকে উঠে তার কক্ষের এক অংশে নিয়মবহির্ভূত গড়ে তোলা আবাসিক স্থানে গিয়ে রেখে ফের এসে চেয়ারে বসেন। এরপর আরও দু’একজনকে ওই কক্ষে যাতায়াত করতে দেখা যায় ভিডিওতে।
ভিওডি বাংলার অনুসন্ধান বলছে, বর্ণালী মণ্ডল ৫ লক্ষ টাকা অধ্যক্ষকে দিয়েছেন একজন শিক্ষকের জাতীয়করণের ঘুষ হিসেবে। এমন আরও ১৬ জন শিক্ষকের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন অধ্যক্ষ। আর কলেজে অনুপস্থিত থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে ঘুরে ঘুরে জাতীয়করণ তদবির করছেন।

তবে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষা অধিদপ্তরে চাকরি করার সুবাধে এসব অনিয়ম করলেও তার কিছুই হয় না। এমনকি অভিযোগ করলে, পত্রিকায় রিপোর্ট হলেও তার কিছুই হয় না। কারণ তার অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও বিসিএস কর্মকর্তা, তার সাবেক সহকর্মী। তাই তারা সহকর্মীর দুর্নীতিকে নরমভাবে দেখে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আর অধ্যক্ষরা উপস্থিত না-কি অনুপস্থিত- তা যাচাই বা খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হলেও তিনি খোঁজ রাখেন না বলে ভিওডি বাংলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কারণ- বেশ কয়েক মাস ধরে চিতলমারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ যে কলেজে উপস্থিত হচ্ছেন না, অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের ফাইলে সই করছেন না টাকা ছাড়া, জাতীয়করণের নামে লাখ লাখ টাকা হাতাচ্ছেন- মোটকথা কলেজটিকে নিজের ঘরবাড়িতে পরিনত করে যা খুশি তা করছেন, সে অভিযোগ ইতোমধ্যেই শিক্ষা অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) একাধিক দপ্তরে জমা পড়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে শিক্ষা অধিদপ্তরে গেলেও দেখা মিলেনি মহাপরিচালকের। দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। তবে নিশ্চিত করেছেন যে, ওই অধ্যক্ষ ছুটি নেননি। তিনি অনুপস্থিত থেকে বেআইনি কাজ করেছেন।
তবে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেছেন, অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন ভিওডি বাংলাকে বলেন, ‘আমি কলেজের কাজে ঢাকায়, তাই অনুপস্থিত।’ ছুটি নিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে বলেন, ‘একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি।’
ঘুষ গ্রহণের ভিডিও সম্পর্কে বলেন, ‘ফোনে এতো কথা হবে না, অফিসে আসেন কথা হবে।’
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) এ কথা যখন অধ্যক্ষের সঙ্গে হচ্ছিলো- তখনও তিনি ঢাকায় ছিলেন। অথচ সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী- কর্ম এলাকা ত্যাগ করলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। কিন্তু তিনি তা নেন না, এতে তার কিছুই হয় না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালীন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়ে এসেছেন নোটিশ বা কাগজে অধ্যক্ষের সই করতে। ওই শিক্ষক কোনো সই লাগলে অধ্যক্ষের সইটি অধ্যক্ষের মতো করেই দিয়ে দেন- যা বেআইনি। এমন বেশ কিছু কাগজ এসেছে যাতে অধ্যক্ষের নকল সই পাওয়া গেছে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে।
চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে অধ্যক্ষ প্রতি মাসে বাড়িভাড়া বাবদ ৪৩ হাজার টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করেন। বাস্তবে তিনি কোনো বাসা ভাড়া নেননি। রীতিমতো থাই গ্লাস দিয়ে পার্টিশন করে কলেজের অফিস রুমকেই বানিয়েছেন নিজের বাসস্থান। যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত বাড়িভাড়া বাবদ প্রায় ৪ লাখ টাকার বেশি সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি।
এছাড়া কলেজের প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অন্তত ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই লুটপাটে তাকে সহায়তা করছেন রসায়নের প্রভাষক তুষার কান্তি সরকার, যুক্তিবিদ্যার বিপ্লব কুমার মজুমদার এবং অফিস সহকারী মাহাবুব আলম।
অবসরপ্রাপ্তদের হয়রানি: অধ্যক্ষের ঘুষের থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না অবসরে যাওয়া বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাও। কলেজটি থেকে অবসরে যাওয়া ৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী গত ৫-৬ মাস ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এলপিআর ও অবসর ভাতার কাগজে স্বাক্ষর করার বিনিময়ে সাবেক অধ্যক্ষের কাছে সরাসরি ৩ লাখ টাকা দাবি করেছেন বর্তমান অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন।
টাকা না দেওয়ায় ফাইল আটকে রেখেছেন। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে হয়রানি করতে কলেজ কর্তৃক ১১ সদস্য বিশিষ্ট অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সমস্ত আর্থিক হিসাব ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ঠিক আছে বলে কমিটি প্রতিবেদন দিলেও এখনো ফাইল নিয়ে কলেজে দিনের পর দিন ঘুরছেন অবসরপ্রাপ্ত সেই অধ্যক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৪বছর শিক্ষাভবনে প্রকল্প পরিচালক (জেলা পর্যায়ে সরকারি পোষ্ট গ্রাজুয়েট কলেজ উন্নয়ন প্রকল্প) থাকাকালে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন নাসির উদ্দিন। ঢাকার মিরপুর-১২ নম্বর পল্লবী থানার সামনে সেগুপ্তা হাউজিং সোসাইটির ৭ নম্বর ভবনের ৫ তলায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। হজ্জ করেছেন ৪০ লাখ টাকা খরচ করে। নিজ গ্রামেও রয়েছে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আর্থিক দুর্নীতির কারণে তাকে ওএসডি করে চিতলমারীতে পাঠানো হলেও তিনি মূলত ঢাকাতেই পড়ে থাকেন।
এমনকি গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসেও তিনি অনুপস্থিত থাকায় কলেজটিতে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।
একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
ভিওডি বাংলা/ইসমাইল/আ







