বৈশাখের প্রথম সকালকে বর্ণিল রূপ দিতে নানামুখী প্রস্তুতি

১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বৈশাখের প্রথম সকালকে বর্ণিল রূপ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে দিনরাত এক করে কাজ করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও দিনটি ঘিরে সারা দেশে চলছে নানামুখী প্রস্তুতি। পুরনো সব জীর্ণতা ও গ্লানি মুছে চৈত্রের দাবদাহ ও রুক্ষতা পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন নতুন বছরের আগমনী বার্তা। এ উপলক্ষে দেশজুড়েই এখন চলছে অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ।
এবছর আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়াই এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য।
এদিকে, জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ আনন্দঘন, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈশাখী শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীগণ মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে মুখোশ হাতে বহন করা যাবে, প্রদর্শনীর জন্য তৈরি মুখোশ এমনভাবে প্রদর্শন করা যাবে না, যাতে মুখ ঢেকে থাকে। অংশগ্রহণকারীদের শুরুতেই মিছিলে যোগ দিতে হবে; মিছিল শুরুর পর মাঝপথে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
এবারের শোভাযাত্রায় লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে পাঁচটি প্রধান মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো হলো—লাল ঝুঁটির মোরগ, দোতারা, সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি, শান্তির প্রতীক পায়রা এবং কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেপা ঘোড়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শোভাযাত্রার জন্য বিশালাকৃতির মোটিফগুলোর কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে একেকটি প্রতীকী অবয়ব।
জয়নুল গ্যালারির সামনে প্রতিবছরের মত এবারেও চলছে মাটির সরায় আলপনা আঁকা, জলরঙে গ্রামবাংলার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা, বাঘ, প্যাঁচাসহ নানা কল্পিত চরিত্রের মুখোশ তৈরির কাজ।
এছাড়া অনুষদের বাইরের দেয়ালগুলোতেও রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেশজ সংস্কৃতির নানা চিত্র। নিজেদের তৈরি এসব শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহ করছেন শিক্ষার্থীরা।
এরআগে গত ৩১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এবারের নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়।
বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত যেসব উপাদান রয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও বর্তমান সময়ে তা সংরক্ষণ করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বর্তমান সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ভোরের আলোয় মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের জানান দেয়, তেমনি এবারের পহেলা বৈশাখে তৈরি করা মোটিফ নতুন জাগরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পীদের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদ ও লোকসংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মোটিফ হিসেবে রাখা হয়েছে দোতারা। আর ঘোড়া ও হাতি বাংলার লোকশিল্প এবং জীবনের গতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করছে।
ঢাবির ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাঈল হোসেন সিয়াম ও প্রিন্টমেকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান শাওন জানান, গত বছরে বিভিন্ন কারণে অনেকেই অংশ না নিলেও এবার শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চারুকলার শিক্ষার্থী দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের শক্ত বার্তা দিতে চাই।’
বর্ষবরণের কর্মযজ্ঞ দেখতে সাধারণ মানুষও চারুকলায় ভিড় করেছেন। মেয়েকে নিয়ে চারুকলায় আসা এক নারী বলেন, ‘বাঙালির ঐতিহ্য কেমন তার ধারণা দিতেই মেয়েকে চারুকলায় নিয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখছি এমন নির্ভেজাল ও নির্মল আনন্দ সচরাচর অন্য কোথাও মেলে না।’
আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘এবারের নববর্ষের প্রস্তুতিতে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও উদ্যমী অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। আশা করি তাদের প্রয়াসের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব সার্থকভাবে আয়োজন হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রেইনবো নেশনের ভিশন জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন, তা এবারের আয়োজনে বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশি ঐতিহ্য উদযাপনের মাধ্যমে আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে।’
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ভিওডি বাংলা’র পাঠকের জন্য আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সভার সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরা হলো
রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হাতিরঝিল ও রবীন্দ্র সরোবরসহ দেশব্যাপী আয়োজিত সকল অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬ টার মধ্যে আবশ্যিকভাবে শেষ করতে হবে। আর বিকেল ৫ টার পর এসব এলাকায় নতুন করে কোনো জনসাধারণ প্রবেশ করতে পারবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি থাকবে।
বৈশাখী শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীগণ মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে মুখোশ হাতে বহন করা যাবে, প্রদর্শনীর জন্য তৈরি মুখোশ এমনভাবে প্রদর্শন করা যাবে না যাতে মুখ ঢেকে থাকে। অংশগ্রহণকারীদের শুরুতেই মিছিলে যোগ দিতে হবে; মিছিল শুরুর পর মাঝপথে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
নিরাপত্তার স্বার্থে দেশব্যাপী ফানুস উড়ানো, আতশবাজি ফুটানো, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেল বা কার রেসিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রমনা বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা এবং পর্যাপ্ত আর্চওয়ে থাকবে। ইভটিজিং, ছিনতাই ও পকেটমার রোধে দেশব্যাপী সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে।
সকল বড় অনুষ্ঠানস্থলে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং মেডিকেল টিম মোতায়েন থাকবে। রমনা লেকে যেকোনো দুর্ঘটনা রোধে ডুবুরি দল নিয়োজিত থাকবে।
পহেলা বৈশাখের দিন (১৪ এপ্রিল ২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (টিএসসি) মেট্রোরেল স্টেশন নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্টিকারবিহীন কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।
সাধারণ মানুষকে ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, দিয়াশলাই বা লাইটার বহন না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া শিশুদের সাথে তাদের পরিচয় সম্বলিত নোট রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সভায় সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এই উৎসবকে নিরাপদ করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ধরনের কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সর্বস্তরের জনগণের যে আনন্দ উৎসব হয়, তা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সেটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর মর্যাদা ও গুরুত্ব বেড়েছে বহুগুণ। বৈশাখকে কেন্দ্র করে মেলা, পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি আর বাউল-ভাটিয়ালির সুরে উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হতে প্রহর গুনছে গোটা দেশ।
ভিওডি বাংলা/এসআর







