প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তেলিয়াপাড়া বৈঠক

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তেলিয়াপাড়া বৈঠক। এই বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে ছত্রভঙ্গ প্রতিরোধ সংগঠিত সামরিক অভিযানের রূপ নেয়।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সিলেট-হবিগঞ্জের মাধবপুর তেলিয়াপাড়ায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের উদ্যোগে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার ৪ এপ্রিল ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি সব কথা বলেন।
ইশরাক বলেন, “প্রথমে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, তেলিয়াপাড়া বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সকল সেক্টর কমান্ডার ও সামরিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পর্যায়ক্রমে প্রথমে কয়েকটি বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে পরবর্তীতে সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সেটিকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ একটি ছত্রভঙ্গ প্রতিরোধ থেকে সংগঠিত সামরিক অভিযানের রূপ নেয়। গেরিলা আক্রমণ, ধ্বংসাত্মক অভিযান এবং কৌশলগত হামলার মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে দুর্বল করা হয়। প্রতিটি সেক্টরে নির্দিষ্ট কমান্ডার নিয়োগের মাধ্যমে নেতৃত্বের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হয়।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, তেলিয়াপাড়া বৈঠক প্রমাণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো আবেগপ্রবণ বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, কৌশলগত এবং সুশৃঙ্খল সামরিক অভিযান।
তিনি বলেন, “কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতার ৫০-৫৫ বছর অতিক্রম হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ইতিহাসকে বারবার বিকৃত করা হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সময় দীর্ঘদিন যাবৎ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। এটিকে একটি দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জাতির কাছে বারবার ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এমনভাবে ইতিহাসকে সাজানো হয়েছে যেন মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ব্যক্তির এবং একটি দলের অর্জন।”
ইশরাক হোসেন বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের নয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জাতির। তেলিয়াপাড়ার এই বৈঠক আমাদের শেখায়, এই দেশ স্বাধীন হয়েছে সম্মিলিত নেতৃত্ব, ত্যাগ এবং পরিকল্পিত সংগ্রামের মাধ্যমে।”
তিনি বলেন, আজকের দিনে নতুন করে শপথ নেওয়া উচিত—ইতিহাস জানতে হবে, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের সকল বীর শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠকদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল একটি আবেগ নয়, এটি একটি কৌশলগত বিজয়ও।
তিনি বলেন, “তেলিয়াপাড়া আমাদেরকে শেখায় পরিকল্পনা ছাড়া সংগ্রাম ফল হয় না। ঐক্য ছাড়া বিজয় আসে না এবং সত্য ইতিহাস ছাড়া জাতি তার পথ হারায়। আসুন আমরা সবাই মিলে সত্য ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করি এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।”
ইশরাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশকে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি “দাস রাষ্ট্র” ও “প্রজারাষ্ট্র”ে পরিণত করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর বহু আধিপত্যবাদী শক্তি বাংলাদেশে এসে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বাংলাদেশকে আবারও একটি দাস বা প্রজারাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
তিনি উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের উদ্দেশে বলেন, “আগামী দিনে আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম এমন একটি সংগঠন গড়ে তুলব, যদি প্রয়োজন হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মত আমরা আবারও অস্ত্র হাতে ট্রেনিং নিয়ে দেশ বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়তে পারি—সেটার জন্য যাতে আমরা প্রস্তুত থাকি, ইনশাল্লাহ।”
ইশরাক হোসেন আরও বলেন, “আমরা প্রয়োজনবোধে আমাদের সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে আবারও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুকরণে ঝাপিয়ে পড়তে হলে, হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হলে, সেটার জন্য আমরা সদা প্রস্তুত থাকব। দেশ ও জাতির কল্যাণে আমরা কাজ করে যাব এবং দেশ রক্ষার জন্য সর্বাত্মকভাবে জীবন দান করার জন্য প্রস্তুত থাকব, ইনশাআল্লাহ।”
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর, সদস্য সচিব সাদেক আহমেদ খান, জেলা প্রশাসক হবিগঞ্জ ড. জি. এম. সরফরাজ, পুলিশ সুপার হবিগঞ্জ মোঃ তারেক মাহমুদসহ প্রমুখ।
ভিওডি বাংলা/সবুজ/এমএস







