নির্বাচনের আগে ঢাকায় নতুন ভোটার তালিকার দাবি আবদুস সালামের

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই নির্বাচন চাই। কিন্তু নির্বাচনের আগে ঢাকা শহরে নতুন করে ভোটার তালিকা আমরা চাই। যারা ঢাকা শহরে থাকেন, তারাই ঢাকা শহরে ভোটার হবে। অন্য জায়গায় থাকবেন আর ভোটের সময় ঢাকা শহরে আইসা ভোট দিবেন, এইটা হইতে পারবে না।
শনিবার (৪ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জিয়া শিশু কিশোর মেলার উদ্যোগে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রশাসক বলেন, ‘ঢাকা শহরের বাড়ি গুলোতে সাতটা-দশটা ভোট ছিল, হঠাৎ করে ১৫০টা ভোট হয়ে গেছে। অনেক বাড়িতে বাড়িওয়ালা জানে না কোথা থেকে হইল, কারা আসলো, কিভাবে আসলো-আজকে আমরা চাই, আপনি অন্য যেখানে থাকেন, ওখানেই ভোটার হোন। ঢাকা শহরে থাকবেন না, ঢাকা শহরে ট্যাক্স দিবেন না, ঢাকা শহরের সঙ্গে সম্পৃক্ত না, আবার ভোটার লিস্টে ঢাকা শহরে নাম রাখবেন-কি কারণে?
আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা তো ভোটের বাইরে কিছু চাই না। এবং আমরা তো বলি, আমি যেটা বললাম, যতবার বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ভোট হয়েছে, ততবার বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আজকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেল সংকট এখনো হয় নাই; কিন্তু আপনারা দেশটাকে সংকটে ফেলতে চাচ্ছেন। বিদ্যুৎ সংকট এখনো হয় নাই। যখন আমার নেতা আজকে বিদ্যুতের ব্যাপারে নিজে চেষ্টা করছেন, নিজের অফিসে এসি চালান না, অতিরিক্ত লাইট জ্বালান না-কিন্তু আপনারা কি করছেন? একজনও তো ঘোষণা দেন নাই যে আমি দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ অপচয় করব না।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশটা সংকটে গেলে লাভ কার? যারা দেশের বিরোধী শক্তি, তাদের। কাজেই আপনারা দেশটাকে কেন সংকটে নিয়ে যেতে চান? এই মুহূর্তে ১৭ বছরের সংকট, একসঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে আরেকটা অর্থনৈতিক সংকট আমাদের সামনে। সাহসের সঙ্গে আমাদের নেতা মোকাবিলা করছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আবদুস সালাম বলেন, নির্বাচনের সময় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এখন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া শুরু হয়েছে, ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে, কৃষকদের ব্যাংকঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ করা হয়েছে। সারা বিশ্ব অর্থনীতির সংকটে, সেই সময় প্রধানমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন-আমার এই দেশের গরিব মানুষকে বাঁচাইতে হবে, আমার কৃষককে বাঁচাইতে হবে, আমার শ্রমিককে বাঁচাইতে হবে।
জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই জুলাই জন্ম আমরা দিয়েছি। যদি ১৭ বছর আমরা আন্দোলন না করতাম, এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করতাম, তাহলে আজকে জুলাই সৃষ্টি হতো না।’
আমরা তো প্রকাশ্যে বলেছি, সেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময়-এই লড়াই একটা বিএনপির লড়াই না, এই লড়াই শুধুমাত্র তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করার লড়াই না। এই লড়াই জনগণের স্বার্থের লড়াই।
আবদুস সালাম বলেন, ‘১৭ বছর তো আমরা রক্তটা দিয়েছি। আমাদের বহু ভাই-বোন গুম হয়েছে, যাদেরকে এখনো আমরা খুঁজে পাই নাই। আমাদের বহু ভাই পঙ্গু হয়েছে, যাদের সেই অঙ্গ, সেই চোখ, হাত-পা আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি নাই। এগুলো কি দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, স্বাধীনতার জন্য না? আমরা তো দিয়েছি সেটা। কিন্তু আমরা সেটার বিনিময়ে কিছু চাচ্ছি না। আমরা চাচ্ছি দেশটাকে গণতান্ত্রিক পন্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।
সরকারের সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে যেমনি দেশের স্বাধীনতা আসে নাই, এই কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে ওই মানুষের পেটে ভাতও যাবে না। সেটার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটাই নিচ্ছেন আমাদের নেতা তারেক রহমান।’
বিএনপির শাসনামল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার পরে যে কয়টা বছর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, সেই সময়টাতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিরাপদ ছিল। অন্য সময় বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিরাপদ ছিল না। আর গণতন্ত্র যদি নিরাপদ না থাকে, স্বাধীনতাও নিরাপদ থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৭টা বছর পরে গণতন্ত্রের মুখ এই দেশের মানুষ দেখছেন। কাজেই একটু ধৈর্য ধরেন। সরকারকে সময় দেন। এক মাস-দুই মাসের মধ্যে সবকিছু পারা যাবে না। কিন্তু আপনারা যদি এক মাস-দুই মাসের মধ্যেই বিরোধিতা শুরু করে হটকারী কর্মসূচি দিয়ে দেশের ক্ষতি করেন, এটার জন্য কিন্তু জনগণও আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না।’
আবদুস সালাম বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘শেখ হাসিনা কোটি কোটি টাকা খরচ করে সারা পৃথিবীতে তাকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। আপনারাও এই নির্বাচনের আগে বিএনপির বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার করেছেন, অনেক বট বাহিনী সৃষ্টি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই দেশের জনগণ জানে যে বিএনপি তাদের একমাত্র বন্ধু, পরীক্ষিত বন্ধু। এবং বিএনপির জন্মই হয়েছে জনগণের পাশে থাকার জন্য, জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সেই কারণে বারবার যখন তারা ভোট দিতে পেরেছে, তখনই তারা বিএনপিকে বেছে নিয়েছে।’
স্বাধীনতার ইতিহাস ও বিএনপির ভূমিকা নিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখেছিলাম, এই দেশের মানুষ দেখেছিল, সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন ইনশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে। এই দেশের জনগণ সুখ দেখবে, সুখের মুখ দেখবে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জন করা যেমনি কঠিন, স্বাধীনতাকে রক্ষা করা আরও কঠিন। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও আজকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে আমাদের মাঝে কাড়াকাড়ি হচ্ছে।’
আবদুস সালামের অভিযোগ, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছেন, তারা মনে-প্রাণে মুক্তিযুদ্ধটাকে চায়নি। সেই কারণে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতি করার চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অন্যায়ের কাছে আপস করেন নাই, নিজে জীবন দিয়েছেন কিন্তু স্বাধীনতাকে সমুন্নত রেখেছেন। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দিয়েছেন, কিন্তু আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে কখনো মাথা নত করেন নাই।’
তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যোগ্য বাবা-মার যোগ্য সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নিজের জীবন বিপন্ন করেও দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে, নির্মূল করে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও অন্যায়ের কাছে আপস করেন নাই। এবং তারই ফলশ্রুতিতে এই দেশের জনগণ তাকে আজকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে, দেশের জন্য রাজনীতি করে। এবং এই দেশকে রক্ষা করার জন্য, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘১৭ বছর স্বৈরাচার ক্ষমতায় ছিল। দেশের অর্থনীতিকে শেষ করে দিয়েছে, দেশের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ করে দিয়েছে। আজকে বিশ্বে এক অর্থনৈতিক মন্দা চলছে যুদ্ধের কারণে। কিন্তু আমরা পার্লামেন্টে কি দেখতে পাচ্ছি? দেশের এই অবস্থাকে মাথায় না রেখে দেশকে আবার আরেকটা ক্রাইসিসের মধ্যে তারা ফেলে দিতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে আজকে এই জুলাইয়ের কথা বলে বা অন্য কিছু বলে বিভ্রান্ত করা যাবে না। বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করে। এবং জুলাই সনদে যা যা পাওনা, সেগুলো অবশ্যই বিএনপি মিটাবে। এই ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য থাকবে না বিএনপির।’ সবার আগে বাংলাদেশ। কাজেই বাংলাদেশটাকে বাঁচাতে হবে, বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।
সংগঠনের সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মালেক; বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার আবু সালেহ এবং বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোশারফ আহমেদ ঠাকুরসহ প্রমুখ।
ভিওডি বাংলা/জা







