জ্বালানির প্রভাবে নিত্যপণ্যের দামে নতুন চাপ

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থার প্রভাব পড়েছে বেশ। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ তেলের দাম না বাড়ালেও নানানভাবে এর প্রভাব নিত্যপণ্যের ওপর পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। সংস্থাটির হিসাবে, জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০ দশমিক ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। জ্বালানি থেকে অন্যান্য খাতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদও দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয় করতে হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি।
এদিকে জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে আমদানি ব্যয়ে। এতে পরিবহন খরচ বাড়ে, যা ধাপে ধাপে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
সরকারি হিসাবে, সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে খাদ্যপণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট ঝুঁকিতে পড়লে তেল পরিবহন ব্যাহত হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপ আরও বাড়বে।
নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক মানুষ বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্য ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে দামের চাপ এলে জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। এক বছর আগে যে খাদ্যপণ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগত, এখন তা কিনতে খরচ হচ্ছে ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। তবে এটি সরকারি হিসাব। ভোক্তাদের দাবি, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি আরও অনেক বেশি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে বাংলাদেশকে ‘লাল’ তালিকায় রাখা হয়েছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা ওই প্রতিবেদনের পরবর্তী সময়েও পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও কাটেনি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উত্তেজনা—বিশেষ করে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা—মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এদিকে নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রয়োজন হলে ভর্তুকি বা নীতিগত সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা দ্রুত না কমলে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়তে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি ও সতর্ক নীতি গ্রহণ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস







