• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

পদ্মা সেতুর চার বছর

বদলে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২৬ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পি.এম.
পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজা। ছবি: ভিওডি বাংলা
পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজা। ছবি: ভিওডি বাংলা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার চার বছর পূর্ণ করলো পদ্মা সেতু। ২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে দেশের বৃহত্তম এই অবকাঠামো শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লবই আনেনি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাতেও এনেছে বড় পরিবর্তন।

চার বছরে পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপার হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৪টি যানবাহন। এই সময়ে সেতুর দুই প্রান্তের টোল প্লাজা থেকে আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ১১৪ টাকা। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেতু চালুর পর থেকেই যানবাহনের চাপ ও টোল আদায় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

সেতুর দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় জানান, উদ্বোধনের পরদিন থেকেই মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে টোল আদায় শুরু হয়। বর্তমানে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম চালুর ফলে যানবাহন পারাপার আরও দ্রুত ও সহজ হয়েছে।    

পদ্মা সেতু চালুর আগে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি ছিল ফেরি পারাপার। দীর্ঘ যানজট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে ঈদ বা ছুটির মৌসুমে এই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যেত।

সেতু চালুর পর সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত অনেক দ্রুত ও সহজ হয়েছে। যাত্রাসময় কমে আসায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এসেছে নতুন গতি। কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো যাচ্ছে।

খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে শিল্পকারখানা ও বিনিয়োগ বাড়ছে। পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, পদ্মা সেতুর নিচতলায় রেল সংযোগ চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতুর রেলপথ উদ্বোধন করা হয়। এরপর ঢাকা-ভাঙ্গা রেল নেটওয়ার্ক চালু হয়। পরে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

বর্তমানে রাজধানী থেকে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় খুলনা ও বেনাপোল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীরা সময় ও খরচ-দুই দিক থেকেই সুবিধা পাচ্ছেন।

রেল যোগাযোগ চালুর ফলে পণ্য পরিবহনেও নতুন গতি এসেছে। ভবিষ্যতে এই রেল নেটওয়ার্ক দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্ট অনুযায়ী, সেতু চালুর প্রথম বছরেই বিপুল পরিমাণ যানবাহন পারাপার হয়।

২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত প্রথম বছরে সেতু দিয়ে চলাচল করেছে ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন। এই সময়ে টোল আদায় হয় ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ টাকা।

দ্বিতীয় বছরে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত যানবাহন পারাপার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ১ হাজার ৩৭৪টিতে। ওই সময়ে টোল আদায় হয় ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫০ টাকা।

তৃতীয় বছরে ২০২৪ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত পারাপার হয় ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি যানবাহন। এ সময় টোল রাজস্ব আসে ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ২ হাজার ৫৫০ টাকা।

সব মিলিয়ে চার বছরে টোল আদায় ৩৩০০ কোটির মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম (ইটিসিএস) যুক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহন থামানো ছাড়াই টোল আদায় সম্ভব হচ্ছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, ইলেকট্রনিক টোল ব্যবস্থার কারণে যানজট কমেছে এবং দ্রুত পারাপার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে পুরো টোল ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পদ্মা সেতু চালুর পর বিভিন্ন সময়ে টোল আদায়ে একাধিক রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় সেতুতে যানবাহনের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

গত বছরের ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপার করে ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন। ওইদিন টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড।

এর পরদিন ৬ জুন ৪০ হাজার ১১৮টি যানবাহন পারাপার করে এবং টোল আদায় হয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা।

এর আগে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল একদিনে ৪৫ হাজার ২০৪টি যানবাহন থেকে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা আদায় হয়েছিল। একই বছরের ১৪ জুন ৪৪ হাজার ৩৩টি যানবাহন থেকে আদায় হয় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা।

এছাড়া ২০২৩ সালের ২৭ জুন ৪৩ হাজার ১৩৭টি যানবাহন পারাপার করে, যেদিন টোল আদায় হয়েছিল ৪ কোটি ৬০ লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ টাকা।

পদ্মা সেতু শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। সেতুর অবকাঠামো ব্যবহার করে দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

২০২২ সালের ডিসেম্বর পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় নির্মিত খুঁটি ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চক্ষমতার ইন্টারনেট লাইনও সেতুর ওপর দিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সেতুতে গ্যাস লাইন স্থাপনের কাজও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংযোগ চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। অ্যাপ্রোচ সড়কসহ পুরো প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ কিলোমিটার।

প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে ব্যয় সাশ্রয় নীতির কারণে চূড়ান্ত ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকায়। এতে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়।

প্রকল্পে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ১ শতাংশ সুদে ৩৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত কিস্তিতে ঋণ শোধ করার সুযোগ রয়েছে।

পদ্মা সেতুতে নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পুরো সেতু ও দুই প্রান্তের এক্সপ্রেসওয়েজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা।

সেতুতে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হচ্ছে।

 ভিওডি বাংলা/জা


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: ভিওডি বাংলা
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠক
ছবি: সংগৃহীত
চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: ভিওডি বাংলা
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা