রাম নবমীতে সিন্দুরমতী পুকুরপাড়ে ভক্তদের ঢল

কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতী পুকুরপাড়ে রাম নবমী উপলক্ষে হাজারো ভক্ত-দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মীয় আচার, লোকজ ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এই আয়োজন।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) ভোর থেকে পবিত্র স্নান, পূজা-অর্চনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনব্যাপী অনুষ্ঠান। ভক্তরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে পুকুরে স্নান করে পূণ্য অর্জনের আশায় অংশ নেন। তবে রাত ১২টার দিকে আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে মেলার কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়।
পরদিন শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল থেকেই আবারও প্রাণ ফিরে পায় মেলা। পুকুরপাড় ঘিরে বসে গ্রামীণ বিভিন্ন দোকান, খেলনা, মিষ্টান্ন ও লোকজ পণ্যের পসরা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যার পর আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে এ বছরের আয়োজন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই পুকুরপাড়ে দিনভর প্রসাদ (খিচুড়ি) বিতরণ, ভোগ নিবেদন এবং পূজা-অর্চনায় মুখর থাকে পুরো এলাকা। ভক্তদের পদচারণায় এটি যেন এক বৃহৎ মিলনমেলায় রূপ নেয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এসে অংশ নেন এ উৎসবে।
উৎসবকে কেন্দ্র করে সিন্দুরমতী পূজা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে বসেছে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি এবং নানা বিনোদনমূলক আয়োজন মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

শুক্রবার দুপুরে মেলা পরিদর্শনে আসেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার, জেলা পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোনীতা দাস, রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল ইমরান, রাজারহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ এবং লালমনিরহাট সদর থানার ওসি আ. মতিনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঐতিহ্যবাহী এই দিঘীকে ঘিরে রয়েছে প্রাচীন লোককথা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে রাজা রাজ নারায়ণ দিঘীটি খনন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও পানি না আসায় দৈববাণী অনুসরণ করে তাঁর দুই কন্যা-সিন্দুর ও মতী-পূজার সময় আত্মত্যাগ করলে দিঘীতে পানির প্রবাহ শুরু হয়। তাদের স্মরণে দিঘীর নামকরণ করা হয় ‘সিন্দুরমতী’।
এছাড়াও প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, চৈত্র মাসের অষ্টমীতে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান শেষে সিন্দুরমতী পুকুরপাড়ে রাত্রিযাপন করে নবমীতে পুনরায় স্নান করলে পাপমোচন হয়। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর ভক্তদের ঢল নামে এখানে।
ধর্মীয় উৎসবটি শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আনন্দঘন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল কঠোর। র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নজরদারি। প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে জুয়া, মাদক ও সার্কাস সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী দুলু বণিক জানান, “শুক্রবার ভোর থেকেই ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে পূজা-অর্চনা শুরু হয়েছে। ভক্তরা স্নান শেষে প্রয়াত স্বজনদের উদ্দেশ্যে অস্থি ও পিণ্ডদান করছেন।”
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার রায় বলেন, “উৎসবকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে এবং প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করছেন। একদিনের মূল আয়োজন হলেও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে এ বছরের স্নানোৎসব ও মেলা।
ভিওডি বাংলা-প্রহলাদ মন্ডল সৈকত/জা







