পদ্মার বাস দুর্ঘটনায় রানা প্লাজার নাসিমার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সও দুর্ঘটনায়

রানা প্লাজা ট্রাজেডির কথা মনে আছে? মনে আছে সেই নাসিমাকে, যিনি রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন দিন পর অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন? সেই সময়ে মৃত্যুকে হার মানালেও এবার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় ডুবে যাওয়া বাসটিতে যে মরদেহ পাওয়া গেছে তার মধ্যে নাসিমার মরদেহও শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। অত:পর সেই মরদেহ নিয়ে দাফনের জন্য বাড়ি রওনা হলে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটিও পড়ে দুর্ঘটনায়।
২০১৩ সালের সাভারের রানা প্লাজা ধসের সেই ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা তিন দিন আটকে থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন নাসিমা বেগম। সেই সময় তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বেঁচে ফেরার এক অনন্য গল্প। অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি যেন মৃত্যুকেও হারিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-এক যুগ পর আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থেমে গেল তার জীবনসংগ্রামের গল্প।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকালে ঈদ শেষে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন নাসিমা। সঙ্গে ছিলেন তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, ভাগনির স্বামী আব্দুল আজিজ আজাদ এবং চার বছরের শিশু আব্দুর রহমান। তারা সবাই একটি যাত্রীবাহী বাসে করে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন।
বিকাল ৫টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যায় পুরো বাস। যাত্রীদের চিৎকার, চারপাশে আতঙ্ক আর অসহায়তার সেই দৃশ্য নিমিষেই পরিণত হয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন যেন চোখের পলকে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও উদ্ধারকারীরা দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করেন। তাদের চেষ্টায় আব্দুল আজিজ আজাদকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু নাসিমা বেগম, তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন এবং ছোট্ট শিশু আব্দুর রহমানকে আর বাঁচানো যায়নি। দীর্ঘ সময় পানির নিচে আটকে থাকার পর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ১১টার দিকে নদী থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মর্মান্তিকতার এখানেই শেষ নয়। স্বজনরা যখন গভীর শোকের মধ্যে মরদেহগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কুষ্টিয়া এলাকায় সেই মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটিও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। যদিও এতে বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পরদিন শুক্রবার (২৭ মার্চ) জুমার নামাজের পর দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। একই পরিবারের তিনজনের এই মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহত নাসিমা বেগম (৪০) ওই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী।
স্বজনরা জানান, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর নাসিমা দীর্ঘদিন গ্রামেই ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আবারও জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার সাভারে ভাগনি আজমিরা খাতুনের বাসায় যান। প্রায় এক মাস চেষ্টা করেও কোনো কাজ জোটাতে পারেননি। পরে ঈদ উপলক্ষে তারা ফরিদপুরে আজমিরার শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখান থেকেই ঈদ শেষে একসঙ্গে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন- যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।
পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল ওয়াদুদ জানান, পুলিশ প্রশাসন শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদ্দাম হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর







