নজরদারিতে শতাধিক পাম্পের মালিক:
জ্বালানি তেলের মজুতের খোঁজে ডিসি-এসপিরা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগে যে পরিমান জ্বালানি তেল দেশের পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হতো, একই পরিমান তেল এখনো সরবরাহ করা হচ্ছে। তখন এই পরিমান তেলে কোনো সংকট ছাড়াই পাম্পগুলোতে এক থেকে দেড় দিনের বিক্রি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হতো। কিন্তু এখন এই তেল দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর এই সময়ের মধ্যে দেশে গাড়ি ও অন্য ব্যবহার্য খাতের সংখ্যা এতটা বৃদ্ধি পায়নি যে এমন সংকট তৈরি হতে পারে। তাহলে জ্বালানি তেল যাচ্ছে কোথায়?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সরকারের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় আবিস্কার করেছে যে, প্রতিদিনই একটি ব্যবসায়ী ও কালোবাজারি চক্র এবং দেশকে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী একাধিক চক্র তেল মজুদ করছে। বিশেষ অভিযান, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাসহ তাদের ধরতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মাঠে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক চৌকস দল, র্যাবের ইন্টিলিজেন্স উইং ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক বিশেষ দল। একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভিওডি বাংলাকে বলেন, ‘বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বিপিসির কর্মকর্তা নজরদারিতে রয়েছেন।’
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুতের সঙ্গে জ্বালানি তেলের ব্যবসায় জড়িত পেট্রোল পাম্প মালিক, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি শ্রেণি এবং একটি বিশেষ চক্র।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অকটেন, পেট্রোল, ডিজেলসহ জ্বলানি তেল প্রতিদিনই মজুত করা হচ্ছে। যা দেশকে অস্থির করে তুলতে পারে।’ এসব গোপন প্রতিবেদনে বিশেষ অভিযান চালানোর সুপারিশ করা হয়।
গবেষণা, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইতোমধ্যেই সরকার বিশেষ অভিযান চালানোসহ বিষয়টি মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেশের সকল জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ডিসি-এসপিরা নিজ নিজ আওতাধীন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছেন। ২৪ ঘণ্টা তদারকির নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। নজরদারি ও কঠোর অবস্থান নিতে বলা হয়েছে।
এদিকে তেল মজুত হচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়ে জ্বালানি মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোকে নিয়ে সমন্বিত বৈঠকও হয়। এসব বৈঠকে উপস্থাপিত গবেষণার ফলাফল, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে মজুতকারীদের খোঁজে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
ইতোমধ্যেই মজুতকারীদের ধরতে মন্ত্রণালয়ের নিদর্দেশনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, তেলের সরবরাহ আগের মতো থাকলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। দেশের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপাররা (এসপি) বিষয়টি মনিটরিং করছেন।
কালোবাজারিরা মজুত করে দেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তোলেন জ্বালানি মন্ত্রী। তিনি বলেন, মজুতকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
দেশের পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিগগিরই তেলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
এদিকে মজুত তেলের সন্ধানে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পর ধরা পড়তে শুরু করেছে কালোবাজারিরা।
এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মধ্যরাতে শেরপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুল হাসান গোয়ালপট্টি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি আবাসিক ভবন থেকে মজুত থাকা ১৮ হাজার লিটার ডিজেল ও কেরোসিন জব্দ করেছেন।
মজুতের দায়ে জ্বালানি তেলের ব্যবসায়ী তাপস নন্দীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে আদালত আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে তেল সরিয়ে নেওয়া এবং ভবন থেকে তেল বিক্রি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযানে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাসরিন আক্তার, সহকারী কমিশনার সেলিম রেজা এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানাও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে প্রতিদিন জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টনের মতো, যার বড় অংশই ডিজেল। বিপরীতে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) স্বাভাবিক সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ থেকে ১২ হাজার মেট্রিক টন তেল পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নানা পদক্ষেপ নিলেও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে সরবরাহে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে একদিকে যেমন সচেতন ব্যবহার জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







