সকালের খুশি সন্ধ্যায় বিষাদ

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অথচ বুধবার সকালেও পরিবারের সাথে হাসি আনন্দে সময় কেটেছে তাদের। সন্ধ্যায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় তাদের সেই আনন্দ বিষাদে রুপ নেয়।
পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় নিহতদের একজন রাজীব বিশ্বাস (৩২)। দুই বছর ধরে ঢাকার সাভারের আশুলিয়াতে ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং অফিসারের চাকরি করতেন তিনি। ঈদের ছুটি শেষে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার খাগরবাড়িয়া থেকে বুধবার তিনি ঢাকায় ফিরছিলেন।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের সঙ্গে রাজীবের কথা হয়েছিল। তিনি মাকে বলেছিলেন, ঢাকায় পৌঁছে কল করবেন। কিন্তু সেই কল আর আসেনি। এদিন বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে বাস পানিতে ডুবে তিনি মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজীবের লাশ কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার স্থানীয় শৈলডাঙ্গী মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। মহাশ্মশানে মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজীবের বাবা হিমাংশু বিশ্বাস।
তিনি বলেন, বুধবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন রাজীব। ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। বাড়িতে তাঁর মাকে বলে যান, পৌঁছে কল করে জানাবেন। কিন্তু বিকেলে তাঁরা জানতে পারেন, ছেলে যে বাসে ছিলেন, সেই বাস পদ্মা নদীতে ডুবে গেছে। এরপর ছেলের মৃত্যুর খবর পান। রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসেন।
রাজীবের ছোট ভাই সজীব বিশ্বাস বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকা থেকে তিনি রওনা দেন। স্বজনেরা রাতেই ভাইয়ের লাশ বুঝে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
একমাত্র ছেলেসন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় নুরনাহার। বাসডুবির কিছুক্ষণ পর তিনি ভেসে ওঠেন। কীভাবে বের হয়েছেন জানেন না। ওই সময়ের বর্ণনা দিয়ে নুরনাহার বলেন, ‘বাস তলিয়ে যাওয়ার সময় সবাই বাসের ভেতর ঘুরতে থাকে। কখন কীভাবে বের হয়েছি কিছুই মনে নাই। শুধু কানে চিৎকার শুনতে পেয়েছি। ভেসে ওঠার পর কয়েকজন আমাকে একটা দড়ির সাহায্যে টেনে তোলে। উঠে নৌকার ওপর স্বামীকে দেখতে পাই। কিন্তু ছেলেকে খুঁজে পাইনি।’
স্বামী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ছেলে আমার হাত ধরে ছিল। বাসে পানি ঢুকে গেলে সবাই ঘুরতে ঘুরতে তলিয়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে ছেলে হাত থেকে ছিটকে যায়। ছেলে চিৎকার দিয়ে ডাকে। এরপর কিছু মনে নাই। আমি কীভাবে ভেসে উঠছি তা আল্লাহ জানেন। উঠে দেখি পাশে ছোট নৌকা। অন্য লোকজন তাতে টেনে তোলে।’
রাজবাড়ীর পাংশায় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে বিলিং সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন মর্জিনা খাতুন (৫৫)। বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের জুগিয়া পালপাড়া এলাকায়। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় মেয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য বুধবার বাসে ওঠেন। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে পড়ে বাসডুবির ঘটনায় তিনি মারা যান।
মর্জিনার বড় মেয়ের জামাই মনোয়ার হোসেন বলেন, দুপুরে বাসে করে তাঁর শাশুড়ি মেয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন। বিকেলের দিকে বাস গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছালে বড় মেয়ে আমেনা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। বড় মেয়েকে জানিয়েছিলেন, ঘাটে বাস থেমে আছে। একটু পর বাস ফেরিতে উঠবে। এর ঠিক ২০ মিনিট পর জানতে পারেন, বাস পানিতে ডুবে গেছে। খবর পেয়ে রাতেই তাঁরা রাজবাড়ীতে যান। এরপর গোয়ালন্দ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
মর্জিনার স্বামী আবু বকর সিদ্দীক বলেন, তিনি ঢাকায় মেয়ের বাসায় ছিলেন। দুপুরে অফিসের কাজ শেষ করে বাসে ওঠার সময় একবার কথা হয়েছিল। এরপর আর হয়নি। হাসপাতালে গিয়ে তিনি মরদেহ দেখতে পান।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। ঢাকার উদ্দেশে বাসটির ছাড়ার সময় মাত্র ছয়জন যাত্রী ছিলেন। এরপর একে একে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠানো হয়।
সৌহার্দ্য পরিবহনের কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনালে অবস্থিত বাসটি কাউন্টার মাস্টার মো. তন্বয় শেখ বলেন, দুপুরে বাসটিতে ছয়জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এরপর খোকসা থেকে ৭ জন, মাছপাড়ায় ৪ জন, পাংশায় ১৫ জন ওঠেন। ইঞ্জিন কাভারেও ৪ জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া গোয়ালন্দ ঘাটে কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ বাসে অন্তত ৫০ জন ছিলেন।
কাউন্টার মাস্টারের ভাষ্য, ৪০ সিটের বাস হলেও ৫০ জন ছিলেন। আবার ফেরিতে ওঠার সময় কেউ কেউ নেমেও যায়। ফলে নদীতে পড়ার সময় কতজন যাত্রী ছিলেন নিশ্চিত নয়।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, বিকেল পাঁচটার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। সোয়া পাঁচটার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি আসে। ওই ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
মনির হোসেন আরও জানান, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। এ সময় বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছেন।’
ভিওডি/আরকেএইচ/এমএস







