ফেরী ঘাটে স্বজনহারাদের আহাজারি

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছে। এ ঘটনায় রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরেজমিন দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বাসডুবির ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনরা আহাজারি করছেন। কেউ লাশ নিয়ে কেউ নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে এদিক ওিদিক ছুটো ছুটি করছেন।
সকাল ঠিক সাড়ে ৯টার দিকে নদী থেকে উদ্ধার করা হয় উজ্জ্বল নামের ৩৫ বছরের এক ফল ব্যবসায়ীর মরদেহ। সেই মরদেহ উদ্ধারের পরপরই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটের পরিবেশ। নিহত উজ্জ্বল হোসেনের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার ঝাও গ্রামে।
সন্তানের লাশের পাশে আহাজারি করছেন বাবা মজনু মিয়া। এর আগে স্বজনরা রাত থেকেই ঘাটে অবস্থান করছিলেন উজ্জ্বলের খোঁজে। ডুবুরি দলের সদস্যরা ৩ নম্বর ফেরিঘাটের প্লটুনের সামনে থেকে প্রায় ৪০ ফুট গভীর পানির নিচ থেকে উজ্জ্বলের মরদেহ উদ্ধার করেন।আহাজারি করতে করতে উজ্জলের পিতা বলেন, ‘ঈদে আমার ছেলে বাড়ি আসে। আমাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ কাটিয়ে বুধবার বিকালে ঢাকায় ফিরছিলো। তখনও জানতাম না আমার ছেলে ওই গাড়ির ভেতরে ছিল। রাতে তার ফোন বন্ধ পাওয়ায় সন্দেহ হলে আমরা পরিবারের সদস্যরা ঘাটে চলে আসি। রাতভর ছেলের খোঁজে কাটিয়ে দিই এখানে। এরপর সকালে আমার ছেলের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে ডুবুরি দল।’
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া বাসডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বাসটিতে প্রায় ৪৫ জনের মতো যাত্রী ছিলেন বলে বাসযাত্রী ও কাউন্টার মাস্টার জানিয়েছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের রাজবাড়ীর কাউন্টার ম্যানেজার সিরাজ আহমেদ জানান, বাসটি কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসে। পাংশা, গান্ধীমারা, সোনাপুর মোড়সহ বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী উঠেছেন। রাজবাড়ী থেকে ১৪ জন যাত্রী উঠেছেন। তখন বাসে যাত্রী, চালক, হেলপারসহ ৪৩ জন ছিলেন। বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর বাসের চালক, হেলপারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছেন।’
রাজবাড়ী জেলার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
মরদেহ পাওয়া গেছে তাঁরা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার রেহেনা আক্তার, তাঁর ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মজমপুর গ্রামের মর্জিনা খাতুন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের রাজীব বিশ্বাস, রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের জহুরা অন্তি, একই মহল্লার কাজী সাইফ, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের মর্জিনা আক্তার, তাঁর মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের শিশু সন্তান ইস্রাফিল, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের সন্তান ফাইজ শাহানূর, রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা মহল্লার কেবিএম মুসাব্বিরের শিশু সন্তান তাজবিদ, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলা গ্রামের গাড়িচালক আরমান খান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দপুর ইউনিয়নের বেলগাছি গ্রামের নাজমিরা ওরফে জেসমিন, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের লিমা আক্তার, একই ইউনিয়নের চর বেনিনগর গ্রামের জোৎস্না, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার আমতলী ইউনিয়নের নোয়াধা গ্রামের মুক্তা খানম, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামের নাছিমা, ঢাকার আশুলিয়া উপজেলার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের আয়েশা আক্তার, রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার শিশু সন্তান সোহা আক্তার, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সমসপুর ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিনের শিশু সন্তান আয়েশা সিদ্দিকা, ঝিনাইদহর শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের শিশু সন্তান আরমান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের শিশু সন্তান আব্দুর রহমান ও রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশি ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের শিশু সন্তান সাবিত হাসান (৮) এবং উজ্জ্বল নামের এক ফল ব্যবসায়ী।
বাস দুর্ঘটনায় বুধবার মধ্যরাতে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক, রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক এবং গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







