তেলের অস্থিরতায় ক্ষুব্ধ পর্যটক, খাগড়াছড়ির পাম্পে সেনা মোতায়েন

ঈদের ছুটিতে পাহাড়, সমুদ্র, চা বাগান, সাদা পাথর কিংবা আকর্ষণীয় কোনো পর্যটন এলাকায় ঘুরতে যাওয়া হবে না— সেটা কি হয়? তাহলে ঈদ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এমন আবেগ আর বন্ধুত্বই তৈরি হয়েছে ঈদের ছুটি আর পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র সৈকতের সঙ্গে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবার আঘাত হেনেছে দেশের মানুষের ঈদ পরবর্তী পর্যটন অভিজ্ঞতায়। পরিবারসহ বা বন্ধুদের সঙ্গে পর্যটক হয়ে ঘুরে ঈদের ছুটি শেষ করে কর্মস্থলে ফেরার সেই আবেগ-অনুভূতি এবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জ্বালানী সংকটে পাহাড়ে, কক্সবাজার সৈকতসহ যারা পর্যটন এলাকায় ঘুরতে গিয়েছিলেন, তারা ঈদের আনন্দ মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। এমনকি তেলের অভাবে গাড়ি বা অন্য যানবাহন নিয়ে ঘুরতে না পারায় ক্ষুব্ধ তারা।
এ অবস্থায় খাগড়াছড়িতে পেট্রোল পাম্পে সেনাবাহিনী মোতায়েনের খবর পাওয়া গেছে। অন্য পর্যটন এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতেও বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। নজর রাখছেন দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যরা।
ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে খাগড়াছড়িতে ছুটে আসা হাজারো পর্যটক ও বাইকারের আনন্দে হঠাৎই ছেদ ফেলেছে জ্বালানি সংকট। বাড়ি ফেরা বা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানো— দুটোই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিন থেকেই জেলার রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের ঢল নামে। টানা ১০ দিনের ছুটিতে বাইকারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ঠিক সেই সময়ে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেকেই সাজেক ভ্রমণ বাতিল করে হতাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে খাগড়াছড়ি সদর জোনের সেনাবাহিনীর একটি টিম সরাসরি তদারকি শুরু করেছে। খাগড়াছড়ি সদর থানার পুলিশ সকাল ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি মো. কায় কিসলু বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের টিম তেলের পাম্পে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। প্রত্যেককে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। আমরা মাঠে আছি, যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে।’
পর্যটকরা অভিযোগ করছেন, ঈদের মতো বড় ছুটিতে পর্যটননির্ভর এলাকায় তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত ছিল।
খুলনা থেকে আসা বাইকার জাহিদ বলেন, জ্বালানি না পাওয়ায় সাজেক যাওয়া হচ্ছে না। আমাদের মতো আরও অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন। এত বড় ছুটিতে এটা পর্যটন খাতের জন্য বড় ধাক্কা।
অফিসের জরুরি কাজে বাইকে তেল নিতে আসা নবলেশ্বর ত্রিপুরা লায়ন বলেন, চার ঘণ্টার বেশি অপেক্ষার পর অবশেষে তেল পেয়ে মনে হলো, ‘আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম!’ প্রথমে যারা পেয়েছিল তারা ১০০০ টাকার তেল পেয়েছে, পরে ৫০০, আর আমার ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ৩০০ টাকার তেল।
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষও সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। মের্সাস মেহেরুন্নেছা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার প্রবীর কুমার দাশ বলেন, ‘ডিপো থেকে দৈনন্দিন চাহিদার তেলই পাচ্ছি না। তার ওপর ঈদের বাড়তি চাপ মিলিয়ে গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন কে.সি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে তেলের সংকট নেই; বরং ঈদের অতিরিক্ত চাপেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘কাগজে কলমে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে। তেলের প্রকৃত সংকট নেই, শুধু ঈদের অতিরিক্ত চাপের কারণে পাম্পগুলোতে সারির সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বাড়তি তেল কিনে মজুদ করছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছি।’
সংকটের মাঝেও পর্যটকদের আগমন থেমে যায়নি। সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানিয়েছেন, একদিনেই দেড় শতাধিক বাইক এবং তিন হাজারের বেশি পর্যটক সাজেকে প্রবেশ করেছেন। তেলের অস্থিরতা ও দীর্ঘ সারির মধ্যেও, পর্যটকরা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগে ব্যস্ত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি, না হলে পর্যটন শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ঈদের আনন্দঘন পরিবেশে খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে এই অপ্রত্যাশিত জ্বালানি সংকটের কারণে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস







